সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে তারা বায়ুদূষণজনিত অসুস্থতায় ভুগছে।
Published : 02 Dec 2025, 08:27 PM
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে রাফসান, তার বয়স ১২ বছর। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে তার চারপাশ ঘিরে থাকে ধুলার আবছা পর্দা। কখনো হেঁটে, কখনো রিকশায় করেই তাকে যেতে হয় সেই ধোঁয়াশায় ভরা রাস্তা দিয়ে। মুখে মাস্ক এখন যেন তার স্কুল ইউনিফর্মেরই অংশ হয়ে গেছে।
রাফসানের মত হাজারো শিশু প্রতিদিন এমন দূষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, যেখানে প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করছে অদৃশ্য বিষকণা। এই বাস্তবতা এখন ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব বড় শহরেরই দৈনন্দিন চিত্র।
বাতাসে জ্বালানি পোড়ার গন্ধ, বাস-ট্রাক-অটোরিকশার ধোঁয়া পেরিয়ে স্কুলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাফসান হাঁপিয়ে ওঠে। অনেকদিন কাশি যেন থামতেই চায় না। মা ভাবেন হয়ত সাধারণ সর্দি-কাশি। কিন্তু চিকিৎসকের ভাষায় এটি 'ক্রনিক রেসপিরেটরি ইরিটেশন', যা এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা। এটি এখন শহরের শিশুদের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সম্প্রতি সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ, সেন্টার ফর অ্যাটমসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস) এবং ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অন সিটিস ফর চিলড্রেন-এর যৌথ জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। এতে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ৫০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, দূষিত বাতাস ও ধোঁয়ার কারণে তাদের শ্বাস নিতে সমস্যা হয়।
রাফসান ছবি তুলতে ভালোবাসে। বাবার মোবাইলে তোলা ঘর-বাড়ির ছবি দেখে আঁকতে গিয়ে সে স্বপ্ন দেখে একদিন স্থপতি হবে। কিন্তু গত কয়েক মাসে তার স্কুলে অনুপস্থিতি বেড়েছে, আর শিক্ষকরাও চিন্তিত তার ফলাফল নিয়ে। যে দূষিত বাতাস তাকে অসুস্থ করছে, সেই বাতাসই নীরবে কেড়ে নিচ্ছে তার শেখার অধিকার।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯৩ শতাংশ শিশু এমন পরিবেশে বাস করছে, যেখানে বাতাসে দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত নিরাপদ সীমার বহু গুণ বেশি।
বর্ধিত যানবাহন, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ এবং জবাবদিহিতার অভাবে ঢাকার মত শহরগুলোতে বায়ুদূষণের পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) তথ্যমতে, ঢাকার বাতাসের মান বর্তমানে 'সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর', যেখানে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) প্রতিদিনই ১৫০ থেকে ২০০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক দূষিত দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। যা শিশুদের শিক্ষাজীবনে বায়ুদূষণের গভীর প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে তারা বায়ুদূষণজনিত অসুস্থতায় ভুগছে, আর ৩৪ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষার্থী অসুস্থতার কারণে এক থেকে তিনদিন পর্যন্ত স্কুলে অনুপস্থিত থাকছে।
এই পরিস্থিতির অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। বায়ুদূষণজনিত রোগে চিকিৎসা ব্যয় দ্রুত বেড়ে চলেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গড়ে একজন মানুষ শ্বাসযন্ত্র-সম্পর্কিত অসুস্থতার কারণে বছরে প্রায় চার হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করছেন।
বায়ুদূষণের কারণ ও উৎস আমাদের জানা, কিন্তু এখন সময় এসেছে সমস্যাটির সমাধানকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার, বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা ও সুস্থতার দিকটি অগ্রাধিকার দিয়ে। কারণ, শিশুরাই নিয়মিত বায়ুদূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার। এই দূষণ তাদের বেড়ে ওঠা, সুস্থ থাকা ও শেখার সক্ষমতাকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দিচ্ছে।
নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। তাই শিশুর সামগ্রিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন:
১. নগরাঞ্চলে ও প্রান্তিক পর্যায়ে উভয় ক্ষেত্রেই শিশুদের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব সম্পর্কিত পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব রয়েছে। শিশুদের জন্য জলবায়ু-ন্যায়বিচারভিত্তিক অ্যাডভোকেসি উদ্যোগকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পৃথক তথ্য সংগ্রহ অত্যন্ত জরুরি।
২. শিশু ও তরুণদের সরাসরি সম্পৃক্ত করা জরুরি, কারণ বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী তারাই। উদাহরণস্বরূপ, সেভ দ্য চিলড্রেন, বাংলাদেশের ন্যাশনাল চিলড্রেন টাস্কফোর্স (এনসিটিএফ) ও সিটিজ ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়ুথ অ্যালায়েন্স-এর মত কার্যক্রমগুলো বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। যেখানে শিশুরা নিজেদের অধিকারের পক্ষে কথা বলার জন্য প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছে।
৩. সংশ্লিষ্ট অংশীদার ও সংগঠনগুলোকে তথ্য-ভিত্তিক জনসচেতনতামূলক প্রচার জোরদার করতে হবে, যা সরকারের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব কমানোর জাতীয় সূচক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
৪. মূল ধারার গণমাধ্যমে শিশুদের কণ্ঠ তুলে ধরার জন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। সেভ দ্য চিলড্রেন ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘চাইল্ড জার্নালিজম ট্রেনিং’ শিশুদের নিজেদের কমিউনিটির গল্প বলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যেখানে তারা শহরের বায়ুদূষণ নিয়ে নিজেদের মতামত জানিয়েছে। এধরনের উদ্যোগ অনুসরণীয়।
৫. স্কুল পর্যায়ে নিয়মিতভাবে বায়ুর মান ও এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি, সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
৬. বায়ুদুষণ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ ও নগর-পরিকল্পনা বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। শিশু-কেন্দ্রিক উদ্যোগগুলো জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
৭. দূষণমুক্ত গণপরিবহন চালু, কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ এবং শিশুদের জন্য সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান তৈরির মত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে শিশুদের ক্ষতিকর দূষণ-সম্পর্কিত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এই সুপারিশগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও বিকাশবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হবে। যেখানে তাদের অধিকার, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ আর বায়ুদূষণের নির্মম বাস্তবতায় হুমকির মুখে পড়বে না।
লেখক: জাকিয়া হক, যোগাযোগ কর্মকর্তা, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ
মো. আব্দুল কাইয়ূম জয়, কো-অর্ডিনেটর, সিটিজ ফর চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়ুথ, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ