প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় সাত মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ এই বায়ুদূষণ।
Published : 02 Dec 2025, 06:51 PM
ঢাকার বায়ুদূষণ আজ এমন এক জটিল সংকটে পরিণত হয়েছে, যেখানে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, নগরায়ণ এবং অর্থনীতি সবকিছুই একই সুতোয় গাঁথা। বছরের বেশিরভাগ সময়েই ঢাকা শহর বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে। এটি যে কোনো বড় শহর বা নগরীর জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র।
আন্তর্জাতিক মনিটরিং সংস্থা আইকিউএয়ার- এর সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, শীতকালে ঢাকার গড় বায়ুমান সূচক (একিউআই) প্রায়ই ২০০–৩০০ এর উপরে অবস্থান করে, যেটি 'অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর' হিসেবে বিবেচিত।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিসংখ্যানও বলছে এই ছবি মোটেই অতিরঞ্জিত নয়। ২০২৪ সালে দেশের গড় অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার (পিএম২.৫) ঘনত্ব ছিল প্রায় ৮০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বার্ষিক নির্দেশক অনুযায়ী, দেশের এই মানমাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানমাত্রা অর্থাৎ পাঁচ মাইক্রোগ্রামের প্রায় ১৬ গুণ। অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা (পিএম২.৫) অর্থাৎ অতি সূক্ষ্ম কণিকা স্বাস্থ্যের দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত।
এই সূক্ষ্ম কণিকা শ্বাসনালীর গভীরে খুব সহজেই প্রবেশ করে অক্সিজেনের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে এবং রক্তে প্রবেশ করলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়াতে সক্ষম। প্রধানত গর্ভবতী নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা বায়ুদূষণজনিত রোগগুলোর ঝুঁকিতে থাকে।
শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও ভয়াবহ প্রভাব বিস্তার করে। তাদের ফুসফুসের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, বারবার সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ দেখা দেয়, যা তাদের শিক্ষাজীবন ও সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে উচ্চ মাত্রার দূষণ প্রিম্যাচিউর ও কম ওজনের শিশুর জন্ম এবং মাতৃ মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। এই দূষণ শুধু পরিবেশের উপরই নয়, মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
ঢাকার বায়ুদূষণের মূল উৎসগুলো বহুমাত্রিক এবং বিস্তৃত। শহরের পুরোনো, নষ্ট ও ডিজেলচালিত যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া, যানজটে দীর্ঘক্ষণ ইঞ্জিন চালু রাখা এবং পুরোনো ইঞ্জিনবিশিষ্ট গণপরিবহন ইত্যাদি সব মিলিয়ে যানবাহন খাতকে দূষণের অন্যতম বৃহৎ উৎসে পরিণত করেছে। এছাড়া শহরজুড়ে বড়-ছোট নানা ধরনের নির্মাণকাজ প্রায় সারা বছরজুড়ে চলে, এবং অধিকাংশ নির্মাণস্থলে যথাযথ ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে ধুলা ছড়িয়ে পড়ে।
শিল্পকারখানাগুলোর অনেকগুলোতেই এখনো কার্যকর এয়ার ফিল্টার বা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নেই বললেই চলে। ব্রিকফিল্ড, গার্মেন্টস, রং ও রাসায়নিক শিল্পকারখানাগুলো থেকে রাসায়নিক দূষক কণা নির্গমন বাতাসকে আরও দূষিত করে তোলে।
শীতকালে ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভারে কৃষিজ অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট ধোঁয়া বাতাসে দূষক কণার ঘনত্ব বাড়িয়ে ঢাকার বায়ুমণ্ডলের ওপর প্রভাব ফেলে। উপরন্তু, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সবুজ এলাকা কমে যাওয়া এবং পরিকল্পনাহীন রাস্তা ও বসতি বৃদ্ধির কারণে বাতাসে দূষক কণার ঘনত্ব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে এদের ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে যায়।
অপরদিকে নির্দিষ্ট আবহাওয়ায় অর্থাৎ শীতকালে ঠাণ্ডা ও প্রবাহহীন বাতাস দূষক কণাগুলোকে মাটির নিকটবর্তী বায়ুস্তরে আটকে রাখে, ফলে দূষক কণার ঘনত্ব আরো বেড়ে যায়।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে নয় জনই দূষিত বাতাস শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং শুধুমাত্র বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ৭০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। অর্থাৎ বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবে অকালে মৃত্যুর শতকরা ৮৯ ভাগ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে হয়ে থাকে।
প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় সাত মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ এই বায়ুদূষণ। পরিবেশগত ও গৃহস্থালিসংক্রান্ত কারণে সৃষ্ট বায়ুদূষণ প্রতি বছর ৬৭ মিলিয়ন মানুষের অকালমৃত্যুর সঙ্গে জড়িত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সময়ে উচ্চমাত্রার দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, কার্ডিওভাসকুলার, ক্রনিক ব্রংকাইটিস, অবসট্রাকটিভ পালমোনারির মত জটিল রোগ হতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কার্ডিওভাসকুলার রোগে ২২ ভাগ, স্ট্রোক ২৫ ভাগ, ফুসফুসের ক্যান্সারে ৪০ ভাগ ও ক্রোনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ৫৩ ভাগ মৃত্যুর জন্য দায়ী বিষাক্ত ও দূষিত বাতাস। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মোট ফুসফুস ক্যান্সার প্রায় ১১ শতাংশের মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ থেকে আসা কার্সিনোজেন।
ইউনিসেফের একটি বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি শিশু প্রতিনিয়ত অস্বাস্থ্যকর বায়ু সেবন করছে এবং এই দূষণ প্রতিদিন পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১০০ শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত।
শহরের এত উচ্চমাত্রার দূষণের পরিণতি শুধুই স্বাস্থ্যগত নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বড় ধরণের অর্থনৈতিক ক্ষতি। গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে, বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মক্ষমতা হারায়, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে এবং অগণিত কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এতে দেশের বার্ষিক জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য হারে ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।
কর্মজীবী মানুষের ফুসফুসজনিত অসুস্থতা বাড়ায় কাজের উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে, আর শিশুদের অসুস্থতার ফলে অভিভাবকদেরও কর্মঘণ্টা ব্যাহত হচ্ছে। এই সকল কারণে বায়ুদূষণ একটি 'নীরব অর্থনৈতিক বোঝা' হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বায়ুদূষণ মোকাবিলায় জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন। বায়ুদূষণ রোধে আমাদের সবার আগে দূষণের উৎসগুলো চিহ্নিত করে দূষণ কমিয়ে আনতে হবে। শুধুমাত্র পরিবেশ অধিদপ্তর বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করবে এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসে যারা দূষণ করছে তারাই এই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করবে এই মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। নিজেদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
ব্যক্তিগতভাবে সুরক্ষার জন্য উন্নত মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। শিশু, অসুস্থ ও গর্ভবতী নারীদের সাবধানতা অবলম্বন করে চলতে হবে। দিনে অন্তত দুই বেলা সকালে ও বিকালে নিয়মিত রাস্তায় পানি ছিটাতে হবে। এছাড়াও সরকার কর্তৃক সিটি করপোরেশন থেকে একটি অনুরোধমূলক নির্দেশনা জারি করে প্রত্যেক ভবনের কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা যেতে পারে, যেন তারা নিজ উদ্যোগে প্রতি দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর তাদের ভবনের সামনের রাস্তায় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করেন।
ঢাকার আশপাশের ইটের ভাটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং আগুনে পোড়ানো লাল ইটের বিকল্প হিসেবে সিমেন্ট বালুর ব্লক ইটের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। ইটের ভাটাগুলোতে উন্নত ও দূষণমুক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পুরনো ও অধিক দূষণকারী যানবাহন ধাপে ধাপে সরিয়ে ফেলতে হবে এবং উন্নত গণপরিবহন বিশেষত বৈদ্যুতিক বাস ব্যবহারে জোর দিতে হবে।
সপ্তাহের ভিন্ন দিনে জোড়-বিজোড় পদ্ধতিতে গাড়ি চলার ব্যবস্থা করতে হবে। শিল্পখাতে পরিশোধন প্রযুক্তি (যেমন ব্যাগ ফিল্টার ও ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রিসিপিটেটর) বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা ক্লিন এনার্জি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সমন্বয়হীনভাবে রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করতে হবে। সেবাদানকারী সংস্থার সংস্কার কাজে সমন্বয় এনে স্বল্প সময়ে সংস্কার শেষ করতে হব। নির্মাণসামগ্রী উন্মুক্তভাবে ফেলে না রেখে সবকিছু ভালভাবে ঢেকে রাখতে হবে। নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে। রাস্তার ধুলাবালি পরিষ্কার, স্ট্রিট-গ্রিনারি এবং নগর সবুজায়ন ক্রমান্বয়ে বাড়াতে হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে করে যেখানে সেখানে নগর বর্জ্য বা কৃষি বর্জ্য উন্মুক্তভাবে পোড়ানো না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। অন্যদিকে প্রচলিত আইনকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একইসঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থার সফল প্রয়োগ একান্তভাবে প্রয়োজন। পাশাপাশি, শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যাপ্ত বায়ু মান মনিটরিং স্টেশন স্থাপন করে রিয়েল-টাইম তথ্য জনসাধারণের কাছে সহজে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে স্কুল, হাসপাতাল ও কর্মস্থলে প্রয়োজন অনুযায়ী সতর্কতা অবলম্বন করা যায়।
সর্বোপরি, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি দেশের আপামর জনসাধারণকেও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
বায়ুদূষণ ঢাকার জন্য এক বড় হুমকি হলেও সমন্বিত পরিকল্পনা, আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে পরিস্থিতি উন্নত করা সম্ভব। এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, দূষণ কমানোর বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, তাহলেই ঢাকা আবারও বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে উঠবে।
লেখক: অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার, ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ; অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং চেয়ারম্যান, বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)।