শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বায়ুদূষণে অনেক বেশি আক্রান্ত হয়।
Published : 02 Dec 2025, 06:15 PM
বাংলাদেশের আকাশ আর আগের মত নীল নেই। ধুলা, ধোঁয়া, ক্ষতিকর গ্যাস আর যানবাহনের নির্গমনে বাতাস ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে। বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণের তালিকায় প্রায়ই ঢাকার অবস্থান থাকে শীর্ষে। এই দূষণ শুধু পরিবেশকেই নয়, সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে ফেলছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, অর্থাৎ শিশুদের।
বায়ুদূষণের বর্তমান চিত্র
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বাতাসের মান বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের শুরুতে প্রকাশিত আইকিউএয়ার- এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকার বাতাসে পিএম ২ দশমিক ৫ কণার ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি।
বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে:
১. পুরোনো ও ধোঁয়াযুক্ত যানবাহন
২. ইটভাটা ও শিল্পকারখানার নির্গমন
৩. নির্মাণকাজের ধুলাবালি
৪. উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো
৫. যানজট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ইত্যাদি
শিশুদের ওপর প্রভাব
শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবে অনেক বেশি আক্রান্ত হয়, কারণ তাদের দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনো পুরোপুরি গঠিত হয়নি। নিচে শিশুদের ওপর বায়ুদূষণের প্রধান ও মারাত্মক প্রভাবগুলো তুলে ধরা হল:
১. শ্বাসযন্ত্রের রোগ বৃদ্ধি:
বাংলাদেশের নগর এলাকায় বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম ধূলিকণা (পিএম ২ দশমিক ৫, পিএম ১০) ও যানবাহনের ধোঁয়া থেকে নির্গত ক্ষতিকর গ্যাস সহজেই শিশুদের ফুসফুসে প্রবেশ করে। এর ফলে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা শ্বাসকষ্টের মত রোগ দ্রুত বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব সমস্যা পরবর্তীতে স্থায়ী ফুসফুসজনিত জটিলতায় পরিণত হতে পারে।
২. মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা:
দূষিত বাতাসে থাকা ভারী ধাতু যেমন সীসা, পারদ ও আর্সেনিক শিশুদের মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এসব উপাদান মস্তিষ্কের কোষের বৃদ্ধি ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমে বাধা দেয়, ফলে শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক বিকাশে ঘাটতি দেখা দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিশুদের শিক্ষাগত পারফরম্যান্সে।
৩. শিশু মৃত্যুহার বৃদ্ধি:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, বাংলাদেশে বায়ুদূষণজনিত শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সংক্রমণের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু অকালেই প্রাণ হারায়। বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য এটি এক নীরব ঘাতক, যা প্রতিদিনের ধোঁয়া, ধুলাবালি ও যানবাহনের নির্গমনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
৪. জন্মের আগে ও পরে জটিলতা:
গর্ভবতী নারীরা যখন দীর্ঘ সময় দূষিত বাতাসে থাকেন, তা শুধু তাদের নয়, গর্ভস্থ শিশুর জন্যও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের দূষণে নবজাতকের কম ওজন, অকাল (প্রিম্যাচিউর) জন্ম এবং জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব জটিলতা ভবিষ্যতে শিশুর শারীরিক বিকাশ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
৫. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়া:
দীর্ঘ সময় দূষিত পরিবেশে বাস করলে শিশুদের শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে তারা সহজেই সর্দি-কাশি, ফ্লু, নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়। দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের কারণে বারবার অসুস্থ হওয়া শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
৬. মানসিক ও আচরণগত প্রভাব:
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণ শুধু শারীরিক নয়, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দূষিত বাতাসে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানগুলো মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট করে, যার ফলে শিশুদের মধ্যে মেজাজ পরিবর্তন, অস্থিরতা, মনোযোগ ঘাটতি এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রভাব শিশুদের মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক আচরণে গভীর ছাপ ফেলে।
পরিবেশবিদদের মতে, এটি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এখন এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট।
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী ১০–১৫ বছরের মধ্যে শিশুদের শ্বাসযন্ত্রের রোগ দেশে মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে।
সরকারি উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ:
সরকার ইতোমধ্যে 'ক্লিন এয়ার অ্যাকশন বা পরিষ্কার বায়ু কর্মপরিকল্পনা' গ্রহণ করেছে এবং ইটভাটাকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে বাস্তবে এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন এখনো ধীরগতিতে চলছে। শহর এলাকায় নির্মাণকাজের ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ, পুরোনো যানবাহন অপসারণ এবং শিল্পনির্গমন মনিটরিং কার্যক্রম এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে।
যদিও আইনগত কাঠামো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, বাস্তব প্রয়োগে এর কার্যকারিতা দুর্বল। পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল ও মনিটরিং সক্ষমতা সীমিত, ফলে নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হয় না। নিষিদ্ধ ইটভাটা, ধোঁয়াযুক্ত যানবাহন এবং নিয়ন্ত্রণহীন নির্মাণকাজ এখনো বহাল রয়েছে। অনেক শিল্পকারখানায় নির্গমন নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপন করা হলেও, সেগুলোর বেশিরভাগই প্রায়ই অকার্যকর অবস্থায় পড়ে থাকে।
তাছাড়া, সাধারণ জনগণ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সচেতনতার অভাব, এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অভিভাবকদের করণীয়:
শিশুদের বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধুলাবালি বা যানবাহনের ধোঁয়াযুক্ত স্থানে নিয়ে যাওয়া এড়াতে হবে এবং বাইরে গেলে মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করতে হবে। বাড়িতে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা ও রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা অত্যাবশ্যক।
শিশুদের পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের মাধ্যমে তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়। পাশাপাশি, স্কুল ও এলাকাভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তোলায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়াও অভিভাবকদের দায়িত্ব।
নিজেদের সচেতনতা ও যত্নের মাধ্যমে অভিভাবকরা শিশুদের বায়ুদূষণজনিত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারেন এবং তাদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারেন।
বায়ুদূষণ প্রতিরোধে করণীয়:
বায়ুদূষণ রোধে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নিচে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ তুলে ধরা হল:
ইটভাটা আধুনিকায়ন: পুরোনো ও দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা।
যানবাহন নিয়ন্ত্রণ: পুরোনো ও ধোঁয়াযুক্ত যানবাহন পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেওয়া, এবং গণপরিবহনকে গ্যাস, বৈদ্যুতিক বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক (যেমন: সৌরশক্তি) ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।
গাছ লাগানো ও সবুজায়ন: শহরাঞ্চলে ছোট পার্ক, ছাদবাগান এবং বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালু করে সবুজ পরিবেশ সৃষ্টি করা।
নির্মাণকাজে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ: নির্মাণস্থল ঢেকে রাখা, নিয়মিত পানি ছিটানো এবং বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করা।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবার, স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে শিশুদের বায়ুদূষণের ক্ষতি ও প্রতিরোধ সম্পর্কে শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানো।
আইনের যথাযথ প্রয়োগ: পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন বিশুদ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারে, এখনই সময় সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের।
লেখক: ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়
(প্রকল্প পরিচালক, হেলথ এন্ড নিউট্রিশন সেক্টর, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ)