মানসিক চাপ সরাসরি ব্রণ তৈরি করে না, তবে সমস্যার তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
Published : 21 Sep 2026, 03:24 PM
পরীক্ষার তীব্র চাপ, কর্মক্ষেত্রের ধকল বা পারিবারিক নানান দুশ্চিন্তার দিনগুলোতে মুখে ব্রণের উপদ্রব বেড়ে যেতে পারে। মানসিক অস্থিরতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ত্বকে আচমকা ফুটে ওঠা এই ফুসকুড়িগুলোকে ‘স্ট্রেস অ্যাকনি’ বা ‘স্ট্রেস পিম্পল’ বলা হয়।
সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির মুখমণ্ডলে লালচে, ফোলা ও পুঁজযুক্ত ছোট ছোট দানা বা ফুসকুড়ি দেখা যায়, যা কখনও কখনও কালচে দাগ বা ক্ষতের সৃষ্টি করে।
অনেকেই মনে করেন, দামি ফেইসওয়াশ বা কসমেটিকস ব্যবহার করলেই বুঝি এই হরমোনাল ব্রণ রাতারাতি দূর করা সম্ভব। তবে এটা ভুল ধারণা। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল বাহ্যিকভাবে যত্ন নিলে, ত্বকের সংবেদনশীল স্তরটি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
স্বাস্থ্য-বিষয়ক পোর্টাল ‘হেলথ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, নিউ ইয়র্কের আইকাহন স্কুল অফ মেডিসিনের চর্মরোগ বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অ্যাঞ্জেলা ল্যাম্ব বলেন, “রক্তে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা এবং মৃদু ক্লিনজারের সঠিক সমন্বয়ে এই ছদ্মবেশী ব্রণ দমন করা যায়।”
মানসিক চাপ থেকে ব্রণ হওয়ার কারণ
লস অ্যাঞ্জেলেসের সিডার্স-সিনাই মেডিকেল সেন্টারের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালিসন কে. ট্রুং একই প্রতিবেদনে বলেন, “মানসিক চাপ সরাসরি ব্রণের জন্ম না দিলেও, আগের সাধারণ ব্রণকে হঠাৎ ‘ট্রিপল স্পাইক’ হিসেবে বাড়িয়ে দিতে পারে। ক্লিনিক্যাল সমীক্ষায় দেখা গেছে, তীব্র মানসিক চাপের মুখে মস্তিস্কের সংকেতে শরীর থেকে ‘কর্টিসল’ নামক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন এবং ‘অ্যান্ড্রোজেন’ নামক যৌন হরমোনের ক্ষরণ অনবরত বাড়তে থাকে। এই হরমোনগুলো ত্বকের নিচের তেলগ্রন্থি ও লোমকূপের গোড়াকে অতিরিক্ত মাত্রায় উদ্দীপিত করে।
ফলে ত্বকে অতিরিক্ত সেবাম বা তেল উৎপাদিত হয়ে মৃত কোষের সঙ্গে মিশে ব্যাক্টেরিয়ার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে। যা ‘স্ট্রেস পিম্পল’ হিসেবে ত্বকের উপরিভাগে প্রকাশ পায়।”
তিনটি ধরন
ডা. অ্যাঞ্জেলা ল্যাম্ব স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মুখে হঠাৎ ওঠা যেকোনো ফুসকুড়িই যে ‘স্ট্রেস ব্রণ’ হবে, তা ভাবা ঠিক না। নিশ্চিত কোনো রোগ নির্ণয়ের আগে নিচে উল্লেখিত ৩টি ভিন্ন সম্ভাবনার কথা মাথায় রাখা উচিত।
ফলিকুলাইটিস: এটি মূলত লোমকূপের গোড়ায় ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া বা ফাঙ্গাসের আক্রমণের ফলে তৈরি হওয়া এক ধরনের সুক্ষ্ম ইনফেকশন বা সংক্রমণ, যা দেখতে ব্রণের মতোই।
অ্যালার্জিক কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস: কোনো নতুন কসমেটিকস, সাবান বা কেমিক্যালের অতি-প্রতিক্রিয়া থেকে ত্বকে হঠাৎ চুলকানিযুক্ত লালচে র্যাশের সৃষ্টি হওয়াকে বোঝায়।
রোজাসিয়া: এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগ যেখানে গাল ও নাক প্রাকৃতিকভাবেই অতিরিক্ত লালচে হয়ে যায় এবং ব্রণের মতো ছোট ছোট কালচে ক্ষত বা ‘সোয়ার্স’ দেখা দেয়।
মানসিক চাপ থেকে হওয়া ব্রণ দূর করার পন্থা
ত্বকের তীব্রতা ও ধরন অনুযায়ী চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা ৩টি চিকিৎসা পন্থার কথা উল্লেখ করেন।
বিকল্প ১ (মেডিকেইটেড ক্লিনজার): হালকা ও মৃদু ব্রণের ক্ষেত্রে বেনজাইল পারক্সাইড, গ্লাইকোলিক অ্যাসিড বা স্যালিসিলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ ফেইসওয়াশ ব্যবহার করলে, ত্বকের তৈলাক্তভাব দ্রুত শুষে নেয়।
সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য স্যালিসিলিক অ্যাসিডের মৃদু ফর্মুলেইশন দিনে সর্বোচ্চ দুবার ব্যবহার করতে পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিকল্প ২ (টপিকাল অ্যান্টিবায়োটিক): মাঝারি ব্রণের প্রদাহ ও লালচেভাব, ভালো করতে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী অ্যাজেলাইক অ্যাসিড, ড্যাপসোন বা ক্লিন্ডামাইসিন সমৃদ্ধ জেল ত্বকে মাখা যেতে পারে।
বিকল্প ৩ (লো-ডোজ রেটিনয়েড): বন্ধ লোমকূপ পরিষ্কারে এবং কোষের পুনর্নবীকরণ সচল রাখতে রাতে ঘুমানোর আগে ০.১ শতাংশ অ্যাডাপালিন জেল বা ট্র্যাটিনয়েন ক্রিম ব্যবহার করা যায়। তবে এক্ষেত্রেও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও সুস্থ জীবনযাপনের বর্ম
ডা. অ্যাঞ্জেলা ল্যাম্ব বলেন, “আপনি যতক্ষণ না প্রধান কারণ অর্থাৎ ভেতরের মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন, ততক্ষণ কোনো দামি ক্রিমই স্থায়ী কাজ করবে না।”
এজন্য প্রতিদিন ১০ মিনিট গভীর শ্বাসের ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মেডিটেইশন বা ধ্যান এবং ডেস্কে একটানা বসে থাকার অলসতা ভেঙে অন্তত ১৫ মিনিট প্রকৃতির মাঝে হাঁটার অভ্যাস তৈরি করলে, কর্টিসল হরমোন কমাতে ভূমিকা রাখে।