এরপর এল ২০১৯ সাল। মায়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম হ্যালোর কথা।
Published : 26 Oct 2026, 08:00 PM
“গ্রহণ করেছ যত, ঋণী তত করেছ আমায়,
হে বন্ধু, বিদায়।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙ্ক্তিগুলো যেন আজ আমার মনের কথাই বলছে।
শিশু সাংবাদিক হিসেবে হ্যালোর সঙ্গে আমার সাত বছরের অধ্যায়ের শেষ পাতায় আজ লিখছি বিদায়ের কথা। তারিখ ২২ অক্টোবর ২০২৬, রোজ বৃহস্পতিবার।
হ্যালোতে আর শোনা যাবে না ঝিলপাড় বস্তি থেকে গার্গী তনুশ্রী পালের কণ্ঠে কোনো প্রতিবেদন। আজ বারবার মনে হচ্ছে, ১৮ বছর বয়স না হলেই বোধ হয় ভালো হত!
স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই অনেক ছড়া-কবিতা শুনেছি। তখনো মোবাইলফোন আমাদের সময়ের এতটা জায়গা দখল করেনি। তাই প্রতি রাতে মা-বাবার কাছে গল্প শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়তাম।
আরও একজন ছিলেন, আমার শিউলি দিদি। তিনি বানিয়ে বানিয়ে কত রকমের গল্প যে শোনাতেন! এসব গল্প, কবিতা আর ছড়া শুনতে শুনতেই হয়ত লেখালেখির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে স্কুলের বিভিন্ন প্রকাশনায় আমার কয়েকটি লেখাও প্রকাশিত হয়েছে।
এরপর এল ২০১৯ সাল। মায়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম হ্যালোর কথা। হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম শিশু সাংবাদিকতার জন্য বিশ্বের প্রথম বাংলা ওয়েবসাইট।
বাবার ফোন নম্বর ব্যবহার করে নিজেই আবেদন করলাম। বাবাকে সবকিছু খুলে বলেছিলাম। একদিন বাবা এসে জানালেন, হ্যালো আমার আবেদন গ্রহণ করেছে। কী নিয়ে লিখব, কাদের নিয়ে লিখব, কীভাবে লিখব, সেসব নিয়ে প্রস্তুতি নিতে বললেন।
এরপর হ্যালোর সঙ্গে আরও কয়েকবার যোগাযোগ হল। ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রকাশিত হল আমার প্রথম প্রতিবেদন, ‘যেভাবে কাটছে সাইদুরের দিনগুলো’। প্রতিবেদনটি ভিডিওসহ প্রকাশিত হয়েছিল।
হ্যালোতে প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে আমার চিন্তা, দেখা ও বোঝার জগৎ ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়েছে। অনেক বছর চেষ্টা করেছি মাসে চারটি এবং বছরে ৫০টি প্রতিবেদন লেখার।
অনেক বছর সেই লক্ষ্য পূরণও করেছি। এ পর্যন্ত আমার ২৫০টির বেশি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরে কত প্রতিবেদন যে প্রকাশের জন্য নির্বাচিত হয়নি, তার কোনো হিসাব নেই।
প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ, ধনী থেকে দরিদ্র, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি। জেনেছি, তারা কী ভাবেন, কী বলেন, কী বিশ্বাস করেন, কেমন তাদের জীবনযাপন। বারবার মনে হয়েছে, তাদের জন্য আমাদের অনেক কিছু করার আছে। এখনো সেই ভাবনা আমাকে তাড়িত করে।
হ্যালোর অনুপ্রেরণায় যে স্কুলটি গড়ে তুলেছিলাম, সেখানকার প্রতিটি শিশু আজ নিজেদের পরিবার ও চারপাশে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ময়মনসিংহের হরিজন পল্লীর বিন সম্প্রদায়ের অনেক কিশোরী নিজেদের সমস্যার কথা জানিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। বাক-প্রতিবন্ধী মণীষা হ্যালোর ওপর আস্থা রেখে নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকিয়েছিল।
তাই এখন বলতে পারি, আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি যতটা সমৃদ্ধ হয়েছে তার বেশিরভাগ কৃতিত্ব হ্যালো ও ইউনিসেফের।
আজ যারা হ্যালোতে কাজ করছ, তাদের বলতে চাই, হ্যালোতে কাজ করলে পড়াশোনার ক্ষতি হয় না। বরং অনেক কিছু নতুন করে জানার সুযোগ তৈরি হয় যা পড়াশোনাতেও কাজে লাগে। নিজের, পরিবারের ও সমাজের সমস্যাগুলো ভালোভাবে বুঝে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যায়। আর লেখালেখির মাধ্যমে যে পরিবর্তন আসে তার সুফল ভোগ করে সবাই।
আজ ঢাকার লালমাটিয়ায় আড়ং সংলগ্ন মাঠটির যে সুন্দর পরিবেশ দেখা যায়, আগে তা ছিল না। এলাকাবাসীর উদ্যোগের পাশাপাশি হ্যালোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনও এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমন আরও অনেক ঘটনা আছে, যেগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, একটি প্রতিবেদনও পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
হ্যালোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি। প্রকাশিত ২৫০টির বেশি প্রতিবেদনের পেছনে রয়েছে অন্তত ৪০০টি গল্প। অপ্রকাশিত গল্পগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম।
হ্যালো শুধু আমার লেখা প্রকাশ করেনি, আমাকে কথা বলতে ও অন্যের কথা তুলে ধরতে শিখিয়েছে। দিয়েছে মাসসেরা ও বর্ষসেরা প্রতিবেদকের পুরস্কার। আমার একাধিক লেখা মনোনয়ন পেয়েছে মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডসেও। সবচেয়ে বড় কথা, আজ আমি যে বাংলা লিখতে পারি, তার পেছনের অন্যতম কারিগর হ্যালো।
হ্যালোর কাছে আমার ঋণ এতটাই গভীর যে তা শোধ করার সাধ্য আমার নেই।
প্রতিবেদক হিসেবে হয়ত আর হ্যালোতে কাজ করব না। কিন্তু হ্যালো যদি কখনো আমাকে ডাকে আমি বারবার ফিরে আসব। কারণ হ্যালো শুধু আমার কাজের জায়গা নয়, আমার বেড়ে ওঠার গল্পেরও একটি বড় অংশ।
প্রতিবেদনটি তৈরির সময় প্রতিবেদকের বয়স: ১৭। জেলা: ঢাকা।