“ছাত্রশিবিরের রাজনীতিটা চলে মিথ্যায় ভর করে। ৫ অগাস্টের পর তারা যা যা বলেছে, তার ঠিক উল্টোটাই করেছে,” বলেন ছাত্রদলের শিপন।
Published : 16 Sep 2026, 10:35 PM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষদে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমন্বয়ক বসানোকে সংগঠনটির ‘প্রতারণা ও মিথ্যাচারের’ নতুন কৌশল হিসেবে দেখছেন ছাত্রনেতারা।
তাদের মতে, হলগুলোর পাশাপাশি ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করতেই সংগঠনটি এসব সমন্বয়ক বসিয়েছে।
তবে ছাত্রশিবিরে বক্তব্য হলো, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সংগঠিত করার লক্ষ্যেই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের ১২টি আবাসিক হল ও ৬টি অনুষদে সমন্বয়ক পদে ১৮ জনকে বসায় ইসলামী ছাত্রশিবির।
তারা সমন্বয়ক বসানোর ঠিক ১৩ মাস আগে, গত বছরের ৮ অগাস্ট হলগুলোতে আহ্বায়ক কমিটি দিয়েছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
এর প্রতিবাদে সেদিন রাতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন একদল শিক্ষর্থী। তারা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন।
দাবির মুখে ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ঘোষণা আসে তৎকালীন উপাচার্য নিয়াজ আহমদের কাছ থেকে। ঘোষণার পরে এ বিষয়ে অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে দাপ্তরিক কোনো নথি বা ঘোষণা আসেনি।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিতে আন্দোলন হলেও এর নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ছিলেন বলে তখন অভিযোগ তোলে ছাত্রদল।
এমন প্রেক্ষাপটে হলে হলে সমন্বয়ক বসানোর ব্যাখ্যায় ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক মিফতাহুল মারুফ বলেন, “প্রথমত বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্ররাজনীতি চলবে কিনা, তার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের দেয়নি।
“দ্বিতীয়ত, আমরা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে দেখছি, ছাত্রদলকে হল প্রশাসন একপাক্ষিকভাবে দাওয়াত দিচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিনিধিত্বের জন্য বাধ্য হয়ে আমরা সমন্বয়ক দিয়েছি।”
হলের কমিটি প্রকাশ না করে কেন সমন্বয়ক দেওয়া হল, এমন প্রশ্নে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিসকে তিনি বলেন, “এটা আমাদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত। আমরা এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, হলে সমন্বয়ক দিব, আমরা সেটা করেছি। সামনে যদি কখনো কমিটি দিতে হয়, আমরা সেটা ভেবে সিদ্ধান্ত নিব।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো ছাত্রনেতার বিশ্বাস, প্রত্যেকটি হলেই ছাত্রশিবিরের কমিটি রয়েছে। কিন্তু ‘প্রতারণার’ আর ‘মিথ্যাচারের’ রাজনীতির অংশ হিসেবে তারা এসব কমিটি গোপন রাখে।
জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক তাহমিদ আল মুদাসসির বলেন, “আমরা যতটুকু জানি, ছাত্রলীগের আমল থেকেই হলভিত্তিক, এমনকি ভবনভিত্তিক কমিটিও আছে ছাত্রশিবিরের।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিসকে তিনি বলেন, “তারা এখনও সেগুলো প্রকাশ না করে নতুন করে সমন্বয়ক দিয়ে বা টিম গঠন করে ছাত্রদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
“আমরা তাদের বলব, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা না করে যেন কমিটিগুলো প্রকাশ করে।"
হলে হলে সমন্বয়ক বসানোকে ছাত্রশিবিরের ‘মিথ্যাচার’ আর ‘প্রতারণার’ রাজনীতি হিসেবে দেখছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও।
সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, “ছাত্রশিবিরের রাজনীতিটা চলে মিথ্যার উপর ভর করে; শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে। ৫ অগাস্টের পর থেকে তারা যা বলেছে, তার ঠিক উল্টোটাই করেছে।
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখন ডাকসু নিয়ে হলভিত্তিক আলোচনা শুরু করেছে, তখন তারা বাধ্য হয়ে একজন করে হল ভিত্তিক সমন্বয়কের নাম ঘোষণা করেছে। কিন্তু এখনও তারা তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেনি। এটা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের প্রতারণার রাজনীতির নুমনা।”
ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সবশেষ বিক্ষোভ দেখা যায় গত মে মাসে।
‘সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে সেই আন্দোলন হলেও তাতে ছাত্রশিবিরের হাত থাকার অভিযোগ তুলেছেন অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতারা।
ছাত্ররাজনীতি বন্ধের পক্ষে হওয়া এসব আন্দোলনের দিকে ইঙ্গিত করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, “৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে ছাত্রশিবির নামে-বেনামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলে। অন্য সংগঠন কমিটি দিলে এর বিরুদ্ধে কথা বলে, মতামত তৈরি করে।
“কিন্তু সম্প্রতি তারা বিভিন্ন হল এবং অনুষদগুলোতে সমন্বয়ক ঘোষণা করেছে। এটা স্পষ্টত দ্বিচারিতা। আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সুস্থধারার ছাত্র রাজনীতির পক্ষে। কিন্তু এটা আজ পরিষ্কার, ছাত্রশিবির পূর্বে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের যে দাবি তুলেছিল, এর সঙ্গে শিক্ষার গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা সে সময় এটি করেছিল ক্যাম্পাসে নিজেদের একক দখলদারিত্ব কায়েম করার স্বার্থে।”
জাসদ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, “৫ অগাস্টের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সোচ্চার ছিল ছাত্রশিবির। অথচ নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি দেওয়ার পর এখন প্রতিটি হল ও অনুষদে ‘সমন্বয়ক’ বসিয়ে নতুন মোড়কে সেই পুরোনো সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের খেলায় নেমেছে। নাম বদলেছে, কৌশল বদলায়নি; সমন্বয়কের আড়ালে লক্ষ্য সেই হল ও ক্যাম্পাসের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিসকে তিনি বলেন, “আর সবচেয়ে হাস্যকর দ্বিচারিতা হলো, বর্তমান ডাকসুর মেয়াদ যখন প্রায় শেষ, তখন একটি ছাত্রসংগঠন হিসেবে তাদের দাবি হওয়া উচিত ছিল দ্রুত নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে ডাকসুর ম্যান্ডেট ফিরিয়ে দেওয়া। অথচ ডাকসু নির্বাচনের দাবি না তুলে তারা হলে হলে ‘সমন্বয়ক’ বসিয়ে নিজেদের অশুভ সাংগঠনিক বলয় শক্ত করছে।
“এটি ছাত্র প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি নয়; এটি নির্বাচিত ছাত্র সংসদকে পাশ কাটিয়ে সমান্তরাল সাংগঠনিক প্রভাবের বিকল্প কাঠামো তৈরির চেষ্টা।”
ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ করে এই ছাত্রনেতা বলেন, “তাদেরকে বুঝতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও অনুষদ তাদের সাংগঠনিক সাম্রাজ্য নয়। ডাকসু দখলের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে না গিয়ে হল দখলের সাংগঠনিক প্রকৌশল চালানো যতই ‘সমন্বয়ক’ নামে সাজানো হোক, শিক্ষার্থীরা এই পুরনো আধিপত্যের রাজনীতি চিনতে ভুল করবে না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রদের ১২টি হল ও ৬টি অনুষদে সমন্বয়ক দিলেও ছাত্রীদের হলগুলোতে কোনো সমন্বয়ক দেয়নি।
এর কারণ জানতে চাইলে মিফতাহুল মারুফ বলেন, “ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক কাঠামো শুধু ছাত্রদের জন্য।”
এক্ষেত্রে ছাত্রী সংস্থা তাদের হয়ে কাজ করছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা দুটি আলাদা সংগঠন। কিন্তু আমরা একই মতাদর্শ ধারণ করি। এক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে আমাদের সাংগঠনিক যোগসূত্র নেই।”
আরও পড়ুন
ঢাবির ছাত্ররাজনীতি: দখলদারির বিরোধিতা কি দখলদারির উদ্দেশ্যেই?
ঢাবির হলে 'গুপ্ত' লেখায় বাধা, ছাত্রদলের বিক্ষোভ-মিছিল
শিবির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘ছাত্রলীগ সেজে’ শিক্ষার্থী ‘নিপীড়নের’ অভিযোগ ঢাবি ছাত্রদলের
ছাত্রলীগে 'গুপ্ত' শিবিরের বিচার দাবি ছাত্রদল সম্পাদকের
শিবিরের 'গুপ্ত রাজনীতি' নিষিদ্ধের দাবিতে রাবি ছাত্রদলের দেয়াল লিখন
শিবিরের 'গুপ্ত রাজনীতি' নিষিদ্ধের দাবিতে শাবিতে ছাত্রদলের দেয়াল লিখন