জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থায়ন, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার যে দাবি, সেটিই মূলত জলবায়ু ন্যায়বিচার।
Published : 11 May 2026, 01:56 PM
জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভাসে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা আর সুপেয় পানির অভাবের মত নানা দুর্যোগের চিত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের যেসব দেশ উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ তার একটি।
জার্মানভিত্তিক পরিবেশবাদী সংস্থা- জার্মানওয়াচে প্রকাশিত ‘ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।
অন্যদিকে জাতিসংঘের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইঞ্জের (আইপিসিসি) ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এসব বিপর্যয়ের পেছনে আমাদের দায় কতটুকু? প্রকৃতপক্ষে জলবায়ু সংকটের পেছনে বাংলাদেশের ভূমিকা খুবই কম। তবে কম দায়ী হয়েও বেশি ক্ষতির শিকার হওয়ায় জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জলবায়ু ন্যায়বিচার কী?
শিল্পোন্নত দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকারখানা, জ্বালানি ব্যবহার ও অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়ন করেছে। কিন্তু এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর ওপর।
তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় অর্থায়ন, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার যে দাবি, সেটিই মূলত জলবায়ু ন্যায়বিচার।
বাংলাদেশে এই বিষয়ে কাজ করছেন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. হাফিজুর রহমান।
হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “উন্নত দেশগুলো শত শত বছর ধরে কার্বন নিঃসরণ করে জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। অথচ এই কার্বন নিঃসরণের বিরূপ প্রভাব এখন আমাদের ওপর পড়ছে। এই সংকট মোকাবিলায় দায়ও তাদেরই বেশি।”
জলবায়ু ন্যায়বিচারের সঙ্গে কোন কোন বিষয় জড়িত?
অধ্যাপক মো. হাফিজুর রহমানের মতে, জলবায়ু ন্যায়বিচার কেবল আর্থিক সহায়তার বিষয় নয়। এর সঙ্গে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সচেতনতা এবং তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তিনি বলেন, “শুধু অর্থ বরাদ্দ পেলেই হবে না, কারণ জানতে হবে কোথায় এবং কোন কাজে এই অর্থের ব্যবহার করতে হবে। তাই তরুণদের ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’ প্রয়োজন। পাশাপাশি অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।”
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের তরুণদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম জলবায়ুর ন্যায্যতা নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তরুণদের এসব উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে আজকের তরুণরাই। পৃথিবীটা যদি বাসযোগ্য না থাকে, তাহলে সেই নেতৃত্বের কোনো অর্থ থাকবে না। তরুণরা যত বেশি জানবে এবং জানাবে, সমাজ ততই সচেতন হবে।”
জলবায়ু ন্যায়বিচার একটি অধিকার
অধ্যাপক মো. হাফিজুর রহমান মনে করেন, দেশের বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীকে জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবিতে একতাবদ্ধ হতে হবে। উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি আদায়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
তার ভাষায়, “জলবায়ু ন্যায়বিচার কোনো দয়া নয়, এটি ন্যায্যতা ও অধিকার। আর সেই অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।”
তরুণরা কী বলছে?
জলবায়ু সচেতনতায় অবদানের জন্য ২০২৩ সালে ইংল্যান্ডের রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটির ‘কুইনস কমনওয়েলথ পুরস্কার’ জেতেন বাংলাদেশের তরুণ আরুবা ফারুক।
হ্যালোকে এই তরুণ জলবায়ু অধিকারকর্মী বলেন, “বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ কিংবা নদীভাঙনের মতো সংকট এখন শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়। এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
তার মতে, সবচেয়ে কম দূষণ করেও বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব বহন করতে হবে।
“এই কারণেই বর্তমান সময়ে জলবায়ু সুবিচারের দাবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা সবচেয়ে কম দূষণ করেছে, তাদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অন্যায়। তাই শুধু সচেতনতা নয়, নীতিগত পরিবর্তন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা এবং টেকসই ভবিষ্যতের জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
আরুবা ফারুকের মতে, তরুণদের এখনই সোচ্চার হওয়া জরুরি। কেননা এই সংকট সরাসরি আমাদের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
তিনি বলেন, “আজ আমরা যদি কথা না বলি, দাবি না তুলি এবং পরিবর্তনের জন্য কাজ না করি, তাহলে ভবিষ্যতে এর সবচেয়ে বড় মূল্য আমাদের প্রজন্মকেই দিতে হবে।”
তরুণদের উদ্যোগ
জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশের অনেক তরুণ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এর মধ্যে একটি হল ইয়ুথনেট গ্লোবাল। সংস্থাটি কয়েক বছর ধরে জলবায়ু সুবিচারের দাবিতে তৃণমূল থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছে।
সংস্থাটির নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান হ্যালোকে বলেন, “আমরা তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ক্ষতিগ্রস্ত কমিউনিটির দাবি-দাওয়া নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরা এবং ন্যায্য রূপান্তরের জন্য প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি।”
সংস্থাটি জলবায়ু ধর্মঘটসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচিও আয়োজন করে।
সোহানুর রহমান বলেন, “তরুণরা রাস্তায় নেমে জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। এর মাধ্যমে আমরা নীতিনির্ধারকদের দ্রুত ও ন্যায্য পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাই এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতের চেষ্টা করি।”
আরও বেশি তরুণকে এগিয়ে আসতে হবে
অধ্যাপক মো. হাফিজুর রহমান মনে করেন, বর্তমানে অনেক তরুণ জলবায়ু সংকট নিয়ে কাজ করলেও এই সংখ্যা এখনও পর্যাপ্ত নয়। তার মতে, উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হলে আরও বেশি তরুণকে একসঙ্গে আওয়াজ তুলতে হবে। তাদের নিজেদের দক্ষ করতে তুলতে হবে।
“মনে রাখতে হবে জলবায়ু সংকট শুধু পরিবেশের নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ, অধিকার এবং টিকে থাকার প্রশ্ন।”
প্রতিবেদকের বয়স: ১৬। জেলা: ঢাকা।