চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার আগেই তাইওয়ান ও মানবাধিকাকে ‘অলঙ্ঘনীয় সীমা’ বলে সতর্ক করেছেন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত।
Published : 23 Sep 2026, 04:10 PM
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে তাইওয়ান ও মানবাধিকার নিয়ে নিজেদের অবস্থানকে ‘রেড লাইন’ (অলঙ্ঘনীয় সীমা) হিসাবে সতর্ক করে দিয়েছে বেইজিং।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত শিয়ে ফেং বুধবার এই সতর্কবার্ত দেন। তিনি জানিয়ে দেন চীনের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের স্বার্থ লঙ্ঘন করা যাবে না, এবং চারটি রেড লাইনকে কোনোভাবেই চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।
এই ৪টি বিষয় হল:
তাইওয়ান: চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। তাই এখানে মার্কিন সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বেইজিং একদমই মেনে নেবে না।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার: মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের অজুহাত দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চীনের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে চীন।
উন্নয়নের পথ ও ব্যবস্থা: চীনের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করার কোনও চেষ্টা বরদাশত করা হবে না।
উন্নয়নের অধিকার: চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্য যুদ্ধ চাপানো যাবে না।
অর্থাৎ, রাষ্ট্রদূত শিয়ে ফেং এটিই স্পষ্ট করেছেন যে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য বা অন্যান্য সহযোগিতা তখনই সম্ভব, যখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের এই ৪ রেডলাইনকে সম্মান জানাবে এবং এই সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করবে না।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি যুক্তররাষ্ট্র সফরের জন্য রওনা হওয়ার আগে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সরকারি পিপলস ডেইলিতে শিয়ে ফেং বলেন, “পারস্পরিক মতপার্থক্য বা বিরোধ মেটানোর বিষয়টি সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। তাই চীনকে দমানোর বা আটকে রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্য এবং জোরপূর্বক শ্রমের মতো ভুয়া অজুহাত তৈরি করা বন্ধ করা।”
"যখন চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র একে অপরকে সহযোগিতা করে, তখন উভয়ই লাভবান হয়, কিন্তু যখন তারা একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।"
"চীন শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আশা করে যে যুক্তরাষ্ট্রও এ পথেই অগ্রসর হবে," বলেন ফেং।
বুধবারেই যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। লাল গালিচা সংবর্ধনায় তাকে বরণ করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং তাইওয়ান ইস্যুর মতো একাধিক জটিল বিষয় নিয়ে বিশ্বের এই দুই দেশের প্রধানরা বৈঠক করবেন।
বিবিসি জানিয়েছে, বুধবার অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে শি জিনপিংকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানানোর কথা রয়েছে ট্রাম্পের।
এরপর বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজে সামরিক ফ্লাইওভার ও প্রায় ৫০০ সামরিক সদস্যের উপস্থিতিতে আয়োজিত হবে বর্ণিল অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর শি জিনপিংয়ের এটি তার সঙ্গে তৃতীয় বৈঠক। পাশাপাশি দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর এটিই শি জিনপিংয়ের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর।
এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকের আবহেই আগামী নভেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে দুই দেশের মধ্যকার বহুল আলোচিত বাণিজ্য চুক্তি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি-র মধ্যকার বৈঠকের পর এই চুক্তিটি হয়েছিল।
সেই চুক্তির আওতায় চীনা পণ্যে ওয়াশিংটনের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ স্থগিত রাখা হয়েছিল এবং প্রযুক্তি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিকা খনিজ (রেয়ার আর্থ) রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল বেইজিং।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুক্রবার শেষ হতে যাওয়া তিনদিনের এই সফরে বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর মতো কোনও ঘোষণা আসে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে সবার।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের এশিয়া বিষয়ক ফেলো ডেভিড স্যাক্স ট্রাম্পের এই রাজকীয় অভ্যর্থনার আয়োজনকে ‘নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, “অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে গিয়ে শি জিনপিংকে স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে তার সম্মানে বিমানবাহিনীর ফ্লাইওভারের আয়োজন করা, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মিত্র দেশের নেতাকেও এমন সম্মান দেওয়া হয় না।
সেখানে চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের নেতার জন্য এই আয়োজন সত্যি অভাবনীয়।” বৈঠকে ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও শুল্ক।
চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী যার পরিমাণ ৯১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
অন্যদিকে, চুক্তি থাকার পরও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে চীনের বিরল মৃত্তিকা খনিজ রপ্তানি কমেছে।
বিবিসি জানায়, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার ফাঁকে দুই দেশের প্রতিনিধিরা বাণিজ্য আলোচনায় বসলেও শি-র সফরের আগে বড় কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারেননি।
এরই মধ্যে রোববার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বাণিজ্য ও এআই নিয়ে এই আলোচনা ‘খুবই সফল’ হয়েছে বলে জানান মার্কিন অর্থমন্ত্রী।
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হিসেবে উঠে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। বুশ চায়না ফাউন্ডেশনের ডেভিড ফায়ারস্টাইন জানান, বৈঠকে এআই বিষয়টি এজেন্ডার শীর্ষতালিকায় চলে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে এআই প্রযুক্তির এক বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তবে সাম্প্রতিক কিছু নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর এআই প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিকাশের লাগাম টানার জন্য চাপ বাড়ছে।
চলতি সপ্তাহে মার্কিন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সমগ্র মানবজাতির স্বার্থে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের এখনই চুক্তি করে এআই প্রযুক্তির বিকাশ স্থগিত করা এবং সুপারইন্টেলিজেন্স নিষিদ্ধ করা উচিত।’
তবে ট্রাম্প এআই প্রযুক্তিতে চীনকে হারানোকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখার মূল লক্ষ্য বলে মনে করেন। তিনি আগেই বলেছেন, “যে এআই প্রতিযোগিতায় জিতবে, জয় তারই হবে।”
কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে তাইওয়ান একটি বড় কৌশলগত বিষয় হিসেবে কাজ করছে। মার্কিন কংগ্রেসে তাইওয়ানের কাছে কয়েক শত কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদিত হলেও ট্রাম্প তাতে এখনো স্বাক্ষর করেননি।
বেইজিংয়ের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ হিসেবেই ট্রাম্প এই অনুমোদন আটকে রেখেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফায়ারস্টাইন মনে করছেন, ট্রাম্প যেন তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি আরও পিছিয়ে দেন অথবা চুক্তিটি সম্পূর্ণ বাতিল করেন, এমন আশ্বাসই আদায়ের চেষ্টা করবেন শি জিনপিং।
এদিকে ঘরোয়া অর্থনীতির মন্দা সামলাতে নিজের দেশে কিছুটা চাপের মুখে আছেন শি জিনপিং ও ট্রাম্প দুজনই। তাই বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছেন তারা। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই চীনকে নিয়ে গভীর অনাস্থা রয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় নিরাপত্তা ও মার্কিন কর্মসংস্থান রক্ষার অজুহাতে ফোর্ড মোটর কোম্পানিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন মার্কিন পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি।
সব বাধা ও মতপার্থক্য সত্ত্বেও ট্রাম্প মনে করছেন, চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখাই দ্বিপক্ষীয় সংঘাত এড়ানোর সেরা উপায়।
ন্যাশনাল কমিটি অন ইউএস-চায়না রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট স্টিফেন অরলিন্স বলেন, “ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, চীনের সঙ্গে সংঘাতের সম্পর্কে যাওয়া যাবে না।
তিনি বিশ্বাস করেন, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার যত বেশি আলোচনা হবে, সম্পর্কের উত্তেজনা ততই প্রশমিত হবে এবং তার এই ধারণাটি সঠিক।”