চীনের সঙ্গে রিয়াদের সামরিক সখ্য নিয়ে উদ্বেগ এবং পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক আধিপত্য ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কা থাকলেও এ বিষয়ে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
Published : 18 Sep 2026, 02:01 AM
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি আরবের কাছে ২৪.৩ বিলিয়ন ডলারে ৪৮টি 'এফ-৩৫ লাইটনিং টু' যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, এই চুক্তির আওতায় যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনির ৪৯টি ইঞ্জিন, যোগাযোগ সরঞ্জাম, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য উপকরণ পাবে সৌদি আরব।
পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই সমরাস্ত্র বিক্রি ‘উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান নেটো-বহির্ভূত মিত্রের’ নিরাপত্তা জোরদার করবে।
“একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করবে।”
চুক্তির মূল ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবে টেক্সাসের লকহিড মার্টিন অ্যারোনটিকস এবং কানেটিকাটের প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি।
গত নভেম্বরে হোয়াইট হাউসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আতিথ্য দেওয়ার ঠিক আগের দিন এই সম্ভাব্য চুক্তির কথা ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য, এফ-৩৫ পাওয়ার মাধ্যমে বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবিলায় সৌদি আরবের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়বে, নিজ ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র, আঞ্চলিক ও নেটো বাহিনীর সঙ্গে সামরিক সমন্বয়ের সক্ষমতা বাড়বে।
এসব জঙ্গিবিমান পেলে সৌদি আরবের আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে হামলার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দেশটির সামরিক উড়োজাহাজের বহরও সমৃদ্ধ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত নভেম্বরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে হোয়াইট হাউসে আতিথেয়তা দেওয়ার এক দিন আগে সৌদি আরবের সঙ্গে এফ-৩৫ চুক্তির প্রস্তাবের কথা ঘোষণা করেছিলেন।
চীনের প্রভাব নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দাদের উদ্বেগ
তবে এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাবটি সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো উদ্বেগও আলোচনায় এসেছে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সামরিক অংশীদার এবং মার্কিন অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। একই সময়ে বেইজিংয়ের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে রিয়াদ।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, সৌদি আরবে গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে চীন এফ-৩৫-এর প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য পেতে পারে। সৌদি সামরিক ও নিরাপত্তা অবকাঠামোতে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বেগের কারণ।
মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে চীনা সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য প্রবেশাধিকার এবং যোগাযোগ অবকাঠামোতে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিশেষ করে হুয়াওয়ে ও জেডটিইর মতো চীনা প্রযুক্তি কোম্পানির সরঞ্জাম সৌদির টেলিযোগাযোগ, রাউটার অবকাঠামো ও কিছু প্রতিরক্ষা স্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, এফ-৩৫ এর উন্নত রাডার ও নজরদারি প্রযুক্তি সুরক্ষিত রাখা যাবে কি না, সেটাও মার্কিন গোয়েন্দাদের চিন্তার বিষয়।
এ ধরনের উদ্বেগ নতুন নয়। এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাব নিয়েও চীনের সঙ্গে দেশটির সামরিক, গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। পরে বাইডেন প্রশাসন ওই বিক্রির প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে তা বন্ধ করে দেয়।
চীনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে রিয়াদ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে সৌদি আরব।
নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, চীনের কাছ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে সৌদি আরব। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলতে, উৎপাদনের জন্য স্থাপনা তৈরি করতে এবং ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনার সক্ষমতা উন্নত করতে চীনা সামরিক বাহিনী সৌদি আরবকে সহায়তা করেছে।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার মধ্যেই এফ-৩৫ কেনার বিষয়টি সামনে এল। ২০১৫ সাল থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে সৌদি আরব।
বৃহস্পতিবার সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া একটি ড্রোন প্রতিহত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ তাইফ প্রদেশে পড়ে একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন।
এর আগে মক্কার দিকে পাঠানো একটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছিল সৌদি আরব। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার কথা অস্বীকার করেছে হুতিরা।
ইসরায়েলের সামরিক ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ নিয়েও প্রশ্ন
সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার প্রস্তাবের ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান আছে কেবল ইসরায়েলের হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের ‘সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব’ বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন কংগ্রেসও এ নীতিকে সমর্থন করে।
এ কারণে পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি বিক্রির প্রস্তাবগুলো অতীতে নানা ধরনের জটিলতায় পড়েছে।
সৌদি আরবের সম্ভাব্য এফ-৩৫ কেনার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদির বৃহত্তর প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত আলোচনার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি উন্নয়নে ট্রাম্প প্রশাসনের সহায়তার প্রতিশ্রুতিও আলাদা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কংগ্রেসের পর্যালোচনা বাকি
সরকারের অনুমোদন পেলেও এফ-৩৫ বিক্রির প্রক্রিয়া এখনই সম্পন্ন হচ্ছে না। প্রস্তাবটি মার্কিন অস্ত্র বিক্রির নির্ধারিত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কংগ্রেসের বিচার-বিশ্লেষণের মুখোমুখি হবে।
কংগ্রেসে বড় ধরনের আপত্তি না উঠলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার, এফ-৩৫ নির্মাতা লকহিড মার্টিন এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা শুরু হতে পারে।