“বয়স্ক ও বিধবা ভাতা হিসেবে পাওয়া ১ হাজার ৪০০ টাকায় তাদের আসলে চলে না।”
Published : 17 Sep 2026, 03:12 PM
কুড়িগ্রামে ৯৯ বছর বয়সী মায়ের একমাত্র সঙ্গী ষাটোর্ধ্ব মেয়ে। স্বামীহারা এই দুই নারীর জীবন কাটছে চরম অভাব, নিঃসঙ্গতা আর জরাজীর্ণ একটি ঘরে। স্বামী ও ছেলে তাদের ছেড়ে চলে গেলেও বৃদ্ধ মাকে ফেলে যাননি মেয়ে। ছোটবেলায় মা যেভাবে মেয়েকে আগলে রেখেছিলেন, এখন ঠিক সেভাবেই মাকে আগলে রেখেছেন তিনি।
প্রতিদিন বহু পথ হেঁটে মানুষের কাছে হাত পেতে যা পান, তা দিয়েই মায়ের মুখে খাবার তুলে দেন মেয়ে।
এভাবেই কঠিন বাস্তবতায় দিন কাটছে নাগেশ্বরী উপজেলার সাজিমন বেওয়া ও তার মেয়ে ছকিনা খাতুনের। এ উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের দিগদারী গ্রামের পঞ্চায়েত পাড়ায় একটি জরাজীর্ণ কুঁড়ে ঘরে বসবাস তাদের। শতবর্ষী সাজিমন বেওয়ার সঙ্গী এখন স্বামী পরিত্যক্তা ৬২ বছরের ছোট মেয়ে ছকিনা খাতুন।
জরাজীর্ণ ঘরের মেঝেতে বসে ছকিনা খাতুন বলেন, এক সময় পাশের কুমারপাড়ায় বাস ছিল মা সাজিমন বেওয়ার। তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সুখেই চলছিল তাদের সংসার। বাবা স্বামী উমর আলী পদ্মপাতা সংগ্রহ করে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করতেন। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে মৃত্যু হয় তার। এরপর মারা যান বড় বোন। সংসারে তখন প্রচণ্ড অভাব।
পুরানো স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলতে লাগলেন, একমাত্র ছেলে মাকে ফেলে স্ত্রীকে নিয়ে দূরে চলে যায়। দ্বিতীয় মেয়ে বিয়ের পর আর মায়ের খোঁজখবর নেয়নি। এদিকে স্বামী আব্দুল লতিফ আচার ফেরি করে বিক্রি করতেন। বিয়ের ছয়-সাত বছর পর কাজের কথা বলে বাইরে চলে যান তিনি। এরপর আর ফিরে আসেননি।
কুমারপাড়ায় অন্যের জমিতে বসবাস করায় এক সময় তাদের সেখান থেকেও চলে যেতে হয়। পরে মৃত বড় মেয়ের ছেলে রাশিদুল ইসলাম নিজের কেনা ছয় শতক জমির এক পাশে একটি ছাপড়া তুলে দেন। সেখানেই এখন ভাঙাচোরা সেই ছাপড়া ঘরে রাত কাটছে বৃদ্ধ মা ও মেয়ের।
সাজিমন ও ছকিনা যে ছাপড়া ঘরে থাকেন, সেখানে নেই কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ। অস্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন আর নলকূপের পানিই তাদের একমাত্র ভরসা।
টানাপোড়েন আর অনিশ্চয়তার মধ্যে শেষ বয়সেও মানুষের মুখাপেক্ষী হয়ে আছেন এই দুই নারী। ঝড়-বৃষ্টি, প্রচণ্ড খরা কিংবা গরম-কোনো ঋতুতেই তাদের বিশ্রামের সুযোগ নেই। শীতের কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতেও শহর থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে শহরে ছুটতে হয় তাদের। মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে যা পান, তা দিয়েই কোনোমতে খাবারের সংস্থান করেন মা-মেয়ে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ে ছকিনা বেওয়া বলেন, “আগে মা আমাকে ভিক্ষা করে খাওয়াইছে, এখন আমি ভিক্ষা করি আনি আমার মাকে খাওয়াচ্ছি। ভিক্ষা পেলে খাই, না পেলে না খায়া থাকি। অনেক কষ্টে আমরা দিন পার করি।”
এদিকে বয়সের ভারে নুয়ে পরা ৯৯ বছর বয়সী সাজিমন বেওয়া এখন কানে ঠিকমতো শুনতে পান না। অন্যের সাহায্য ছাড়া হাঁটতেও পারেন না। একটুতেই হাঁফিয়ে ওঠেন তিনি।
জীবন সংগ্রামে চরম অর্থকষ্টের মধ্যে বেড়ে ওঠা এই নারী মধ্য বয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন। একাই ভিক্ষাবৃত্তি করে চার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। এখন তিনি বয়সের ভাড়ে অচল। ছোট মেয়েই তার একমাত্র ভরসা।
সাজিমন বেওয়া বলছিলেন, “বাবা, খাবার পাই না, গাও কাঁপে। হাত দুটো কাঁপে। কাপড়চোপড়ও নাই।” কথাগুলো বলতে বলতে তিনি ইশারায় কাঁপতে থাকা নিজের দুই হাত দেখান।
সাজিমন বেওয়ার মৃত বড় মেয়ের ছেলে রাশিদুল ইসলাম বলেন, “আমার নানির থাকার কোনো জায়গা নাই। আমি ছয় শতক জমি কিনে বাড়ি করেছি। সেখানে নানী ও ছোট খালার থাকার জন্য একটা ছাপড়া তুলে দিয়েছি।
“আমার একজন মামা আছে তিনি কোনো খোঁজ খবর নেন না। আমি দিনমজুরী করে খাই। নিজে ঠিকমতো চলতে পারি না। ফলে নানিকে সাহায্য করতে পারি না। খালা ভিক্ষা করে এনে নানীকে খাওয়ায়। খুব কষ্টে আছে তারা।”
সাজিমন-ছকিনার প্রতিবেশী ময়মনা বেগম বলেন, “মা-মেয়ে দুজনেই বয়স্ক। এদের কিছুই নাই। হাট-বাজারে বিভিন্নজনের কাছে একটা আলু, পিঁয়াজ বা বেগুন ভিক্ষা করি নিয়া আসি সেটাই রান্না করি খায়। অবস্থা খুবই খারাপ।”
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি বলেন, “বয়স্ক ও বিধবা ভাতা হিসেবে পাওয়া ১ হাজার ৪০০ টাকায় তাদের আসলে চলে না। সংসারে কোনো পুরুষ মানুষও নেই। দুজনেই বয়সের ভারে এখন ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না।”
তিনি বলেন, “আমরা যতটুকু পারছি সহযোগিতা করছি। এখন অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে এ দুই বৃদ্ধ নারী শেষ বয়সে একটু সুন্দরভাবে বাঁচতে পারবেন।”