তাদের ব্যাংক হিসাবে ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকার ‘অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক’ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে দুদকের নথিতে।
Published : 16 Sep 2026, 07:26 PM
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ চারজনের বিরুদ্ধে ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার ‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জন এবং ব্যাংক হিসাবে ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকার ‘অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক’ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বুধবার এই চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি।
মামলার অপর তিন আসামি হলেন—আনিসুলের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম হক কলি, ভাগ্নে শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলাম এবং ‘কাজিন’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইকবাল।
দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান এক ব্রিফিংয়ে বলেন, “ওই তিন ব্যক্তি আনিসুল হককে অবৈধ সম্পদ অর্জনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন। এ কারণেই তদন্ত শেষে তাদেরও আসামি করা হয়েছে।”
যেভাবে হিসাব হল ‘অবৈধ’ সম্পদের
দুদক বলছে, তদন্তে আনিসুল হকের বৈধ বা গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ১৩ কোটি ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৮ টাকা। এর বিপরীতে তার পারিবারিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৯৮ টাকা। ব্যয় বাদে তার নিট সঞ্চয় দাঁড়ায় ৮ কোটি ৬১ লাখ ৪০ হাজার ৯৪০ টাকা।
কিন্তু আনিসুল হক নিজের এবং অপর তিন আসামির নামে মোট ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮১ টাকার সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক।
ফলে গ্রহণযোগ্য নিট আয় বাদ দিলে বাকি ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার সম্পদকে ‘জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ’ বা অবৈধ বলা হয়েছে দুদকের নথিতে।
২০০০ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত সময়ে এসব সম্পদ অর্জিত হয়েছে বলে দুদকের ভাষ্য।
এর মধ্যে আনিসুলের নিজ নামে স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে মোট ৯৬ কোটি ৮০ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮০ টাকার সম্পদ রয়েছে। বাকি ৮৪ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার ১ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে ওই তিন স্বজনের নামে।
তদন্তে জেবুন্নেসা বেগম হক কলির নামে ২৩ কোটি ৩২ লাখ ২ হাজার ৩২১ টাকা, ইফতেখারুল ইসলামের নামে ২০ কোটি ৭১ লাখ ৮১ হাজার ৪৪৪ টাকা এবং বিএইচআইএস অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবালের নামে ৪০ কোটি ১ লাখ ২৩ হাজার ২৩৬ টাকার অস্থাবর সম্পদ পাওয়ার কথা বলছে দুদক।
এই তিনজনের নামেই সিটিজেনস ব্যাংকের বিপুল শেয়ার রয়েছে, যার মোট দাম ৭০ কোটি টাকার বেশি।
৭৩৭ কোটি টাকার ‘সন্দেহজনক’ লেনদেন
তদন্তে আনিসুল হক এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২৩টি ব্যাংক হিসাবে ‘অস্বাভাবিক’ লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা বলছে দুদক।
এসব হিসাবে মোট ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫২ টাকা জমা এবং ৩৬১ কোটি ৭৩ লাখ ২৭ হাজার ১২৯ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
দুদক বলছে, জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে মোট ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকার এই লেনদেন ‘অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক’।
‘দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে’ পাওয়া অর্থের অবৈধ উৎস গোপন করতে এবং তা রূপান্তর ও হস্তান্তরের উদ্দেশ্যেই এসব লেনদেন করা হয়েছে বলে দুদকের সন্দেহ।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম।
মামলার এজাহারে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ১৪৬ কোটি ১৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ছিল। তবে তদন্ত শেষে অবৈধ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৬ কোটি ৪ লাখ টাকা বেড়েছে।
একইভাবে এজাহারে ২৯টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকার লেনদেনের কথা বলা হলেও, তদন্ত শেষে ২৩টি ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৭১ কোটি ৬০ লাখ টাকা বেশি পাওয়া গেছে।
মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারা যুক্ত ছিল। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রে এই চার আসামির বিরুদ্ধে এসব ধারার পাশাপাশি অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনার দায়ে দণ্ডবিধির ১০৯ ধারাও যুক্ত করা হয়েছে।
আনিসুল হক ২০১৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরপর টানা তিন মেয়াদে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ১৩ অগাস্ট ঢাকার সদরঘাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দুদকের এই অবৈধ সম্পদের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেয় আদালত। এরপর ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালত তার ও সংশ্লিষ্টদের ২৭টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দেয়।