যে দেশে কেবল চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই দুই হাজারের বেশি শিশু লাপাত্তা হয়ে গেল, সেই দেশ কি আর আমাদের সন্তানদের জন্য বাসযোগ্য আছে?
Published : 20 Sep 2026, 09:26 AM
একজন মায়ের সন্তানকে খুঁজে না পাওয়ার কাকুতিভরা ফেইসবুক পোস্টে সবাই যখন উদ্বিগ্ন, ঠিক তখন সেই নিখোঁজ সংবাদ শিশু হত্যার ভয়াবহ বার্তা হয়ে ফিরে এসে আমাদের ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে গেল। নিহত অপ্রতিমের মা-বাবাই জানেন বুকের ভেতরকার যন্ত্রণার গভীরতা; এই যন্ত্রণা বাইরে থেকে দেখা যায় না, দেখা সম্ভব না।
দেশটা দিনে দিনে নির্মম হত্যাপুরীতে রূপান্তরিত হতে চলেছে; অবোধ, নিষ্পাপ অপ্রতিমদের নির্মম বিদায় এবং নিখোঁজের মিছিলে আর কত প্রাণ ঝরলে পরে রাষ্ট্রের ঘুম ভাঙবে? দেশটাকে শিশুর বাসযোগ্য করার ব্যাকুল আকুতি কি কেবল আর্তনাদ হয়ে থেকে যাবে?
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা শুধু আইনি ব্যর্থতা নয়, সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্রের চরম নৈতিক পরাজয়। প্রতিদিনের এই আতঙ্ক যদি আমাদের বিবেককে স্পর্শ করতে না পারে, তবে আমাদের এই উন্নয়নের স্লোগান, অর্জিত স্বাধীনতা, রাজপথ কাঁপানো জুলাই চেতনার স্লোগান—সবকিছু অর্থহীন হয়ে যাবে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এবং পরে তার মৃতদেহ উদ্ধারের যে ছবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যম সয়লাব, তা কি এদেশের প্রতিটি মা-বাবার বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়নি? অপ্রতিম, যার কোনো তুলনা নেই—মা-বাবা কত ভালোবাসা দিয়ে রেখেছিলেন এই নাম। তারা কি কখনও ভেবেছিলেন তাদের এই আদরের অপ্রতিমের নিথর দেহ তাদেরই দেখতে হবে? যে রাষ্ট্র পারছে না শিশুর নিরাপত্তা দিতে, সেখানে তথ্যপ্রযুক্তি আর জীবনযাত্রার মান বাড়িয়ে কী লাভ, যেখানে জীবনেরই কোনো নিশ্চয়তা নেই? সুযোগ পেলে আমরা কি এই দেশে থাকার মানসিকতা রাখার মতো অবস্থাতে আছি?
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তা কি কোনো সাধারণ অপরাধের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ আছে? পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের কেবল প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি থেকে জুলাই) দেশজুড়ে ১৫,৭১৭ জন শিশু নিখোঁজের জিডি (সাধারণ ডায়েরি) নিবন্ধিত হয়েছে। যদিও পুলিশের তৎপরতায় ও উদ্ধার অভিযানে এদের একটি বড় অংশ পরিবারে ফিরে এসেছে, তবুও ২,০ ৩৮ জন শিশু এখনও নিখোঁজ থেকে গেছে। অর্থাৎ, কেবল চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই দুই হাজারেরও বেশি শিশু তাদের চেনা জগৎ থেকে একেবারে হারিয়ে গেছে, যাদের চূড়ান্ত পরিণতি কী হয়েছে তা আমরা কেউ জানি না।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের পেছনে মূলত হাসপাতাল থেকে চুরি থেকে শুরু করে পথ ভুলে যাওয়া বা অপরিচিত স্থানে হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা থাকলেও, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের নিখোঁজ হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। পুলিশের ভাষায় এর পেছনে পারিবারিক অভিমান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব এবং মানসিক চাপের মতো কারণ থাকলেও, এই নিখোঁজের সুযোগ নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠছে নানাবিধ অপরাধী চক্র। অন্যান্য বয়সের শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি এটা দেখা প্রয়োজন যে, কেন একটা নির্দিষ্ট বয়সের কিশোর-কিশোরীদের নিখোঁজ হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এর পেছনে কি কোনো সুগভীর চক্রান্ত চলছে? তাদের দিয়ে কি কেবলই ভিক্ষাবৃত্তি বা দেহব্যবসা করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, নাকি কোনো বড় ধরনের সহিংসতায় তাদের জড়ানোর কোনো গভীর চক্রান্ত চলছে?
অপ্রতিমের এই ট্র্যাজেডি নিছক কোনো হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়, এটি একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নজরদারির চরম ব্যর্থতার ফল। একটি ১৩ বছরের কিশোর কীভাবে নিখোঁজ হয়ে জঙ্গল থেকে লাশ হয়ে উদ্ধার হয়, এই প্রশ্ন আজ রইল পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে।
অপ্রতিমের এই ঘটনা ছাড়াও কুমিল্লা জেলা থেকে নিখোঁজের তিন দিন পর ৯ বছরের শিশু রাফির লাশ উদ্ধার করা হয়। পাবনা জেলা থেকে নিখোঁজের ৭ দিন পর ১০ বছরের শিশু কামরুননাহার কলির লাশ পাওয়া যায়, জামালপুরে নিখোঁজের ৩ দিন পর ৭ বছরের মারিয়ামের লাশ উদ্ধার হয়, গাজীপুরে নিখোঁজের দুই দিন পর মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ৫ বছরের বায়েজীদকে, ময়মনসিংহে নিখোঁজের ৩ দিন পর ২ বছরের আব্দুল্লাহর মৃতদেহ পাওয়া যায়, নরসিংদীতে ৪ দিন পর ৭ বছরের তাসকিয়াকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, ময়মনসিংহে নিখোঁজের ৮ দিন পর সাওমি সাবাকে পাওয়া যায়—যার বয়স ছিল ৭ বছর, নারায়ণগঞ্জে নিখোঁজের দেড় বছরের মাইশাকে ২ দিন পর পাওয়া যায় মৃত অবস্থায়, ঢাকার নিকুঞ্জ-২ থেকে ১ দিন পর ৪ বছরের সাদ্দাতের লাশ পাওয়া যায়, লালমনিরহাটে নিখোঁজের ১ দিন পর পাওয়া যায় ৭ বছরের নন্দিনীর লাশ, টাঙ্গাইলের ৮ বছরের সেঁজুতিকে ২ দিন পর পাওয়া যায় লাশ হিসেবে, বগুড়ার ৬ বছরের রাফিকা আক্তার রাকাকে বস্তাবন্দি অবস্থায় পাওয়া যায়। আরও আছে রাজশাহীর ৮ বছরের হুমায়রা, সিলেটের ৫ বছরের মুনতাহা আক্তার আর ৪ বছরের ফাহিমা বেগম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিশাত, মানিকগঞ্জের ৯ বছরের আতিকাসহ আরও নাম না জানা অনেক শিশু। প্রশ্ন জাগে, দেশে এতগুলো শিশু নিখোঁজ এবং পরবর্তীতে হত্যা হলো, পুলিশ তাহলে কী করছে? তাদের কাজ কি শুধু মৃতদেহ উদ্ধার করা?
সাধারণ জনগণ বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজতে পারে, কিন্তু তারা কি চেনে অপরাধীদের আস্তানা? এটা তো পুলিশের জানার কথা, কারণ তারা এসব নিয়েই কাজ করে। তাহলে তারা তখন কী করছিল, যখন এতগুলো বাচ্চা নিখোঁজ হলো? তারা যখন সময়ের কাজ সময়মতো করতে ব্যর্থ হয়, তখনই এই ধরনের মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক পরিণতির সৃষ্টি হয়।
একজন অভিভাবক হিসেবে অপ্রতিমের ঘটনা এবং প্রতিদিনের নিখোঁজের খবরগুলো পড়ার পর আতঙ্কিত বোধ করছি। ভয়ে হাত-পা জমে যাচ্ছে, নিশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে। এ কোন সমাজে বসবাস করছি আমরা? অন্যের সন্তানের ক্ষতি করার সময় একটুও কি পাষাণ হাত কাঁপে না, প্রকৃতিরও বিচার আছে বলে একটা কথা ভেবে? তাই, সন্তানকে আর ডাক্তার, প্রকৌশলী বা পাইলট না বানিয়ে, প্রবাসী বানান—অন্তত প্রাণে বাঁচবে। আর প্রবাসী হয়ে প্রাণে যদি না-ও বাঁচে, তাহলে অন্তত বিচারটা পাবে। আমাদের অভাগা দেশে তা-ই বা কোথায় পাই? নিজের সন্তানের সুরক্ষায়, আমি আর আমার সন্তানকে বাইরে খেলতে দেব না, তাকে আর সামাজিক হয়ে বেড়ে উঠতে দেব না। আমি চাই না সে কারও স্পর্শে আসুক, কোনো অনিষ্ট, নির্যাতন কিংবা হত্যাকাণ্ডের শিকার হোক। আমি শুধু চাই আমার সন্তান নিরাপদে বেঁচে থাকুক।
কিন্তু একটি শিশুকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ঘরে বন্দি করে রাখার এই চিন্তা কি একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ? নিজের সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার এই তীব্র আকুতি আর চরম আতঙ্ক কি একজন অভিভাবকের ব্যর্থতা, নাকি যে রাষ্ট্র ও সমাজ শিশুর নিরাপদ বেড়ে ওঠার ন্যূনতম নিশ্চয়তা দিতে পারছে না, এটি তাদের ব্যর্থতা?
সংকটের গভীরে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সাইবার সুরক্ষার অভাব ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং অপরাধী চক্রের তৎপরতা। অনলাইনে জিডি সুবিধা চালু হওয়ায় অনেক ঘটনা সামনে আসছে সত্য, কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টার ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এ কার্যকর যৌথ অনুসন্ধান ও নজরদারির ব্যবস্থা এখনও বেশ দুর্বল। আর কত মায়ের বুক খালি হবে বলে এখনও জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছি না?
প্রতিটি শিশু একেকটি সম্ভাবনার নাম। অপ্রতিমের মতো সম্ভাবনাময় প্রাণগুলো যখন চোখের সামনে ঝরে যায়, তখন সভ্যতার অগ্রগতি থমকে দাঁড়ায়। মেট্রোরেলে অবাধ চলাফেরা তখন আর মনে স্বস্তি জোগায় না। ২,০৩৮টি পরিবার হয়তো আজ রাতেও তাদের নিখোঁজ সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে ঘুমোতে যাবে। তাদের এই সীমাহীন উৎকণ্ঠার অবসান ঘটানো এবং প্রতিটি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।
রুদমিলা মাহবুব ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের সিনিয়র লেকচারার। ই-মেইল: rudmila.bracu@gmail.com