শিক্ষায় নীতি-নৈতিকতার অনুপস্থিতি, মাদকের সহজলভ্যতা আর প্রশাসনের নীরবতা—অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের পচে যাওয়া সামাজিক ব্যবস্থারই করুণ ফল।
Published : 21 Sep 2026, 06:14 PM
অপ্রতিমের চেহারাটা যতবার দেখছি, ততবারই ভয়ঙ্কর আশঙ্কায় কেঁপে উঠছে বুক। এমন ঘটনা তো ঘটতে পারে যে কোনো পরিবারেই। তাহলে কীভাবে বাঁচানো যাবে আমাদের সন্তানদের? অপ্রতিমের হত্যার ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে পুরোনো একটি নির্মম বাস্তবতা; সেটি হলো, কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা।
গত এক-দুই দশক ধরেই ‘কিশোর গ্যাং’ নামের একদল অপরাধীর চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই অপরাধীদের গড় বয়স আঠারো বছরের নিচে, অথচ এরা একেকটি এলাকায় খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ, মাদক সেবন, অপহরণ ইত্যাদির মতো বিভিন্ন অপরাধের মূল হোতা। এই অপরাধী কিশোর-তরুণরা পাড়ায়-মহল্লায় চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম অপরাধের সঙ্গে খুব সহজেই জড়িয়ে যাচ্ছে। এলাকার স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোরী-তরুণীদের উত্ত্যক্ত করছে, এমনকি ধর্ষণ ও হত্যার মতো বড় অপরাধও ঘটাচ্ছে। এরা এলাকার ছিন্নমূল শিশুদের ওপরও নির্যাতন করছে, কখনও কখনও তাদের দিয়ে মাদক আনা-নেওয়া করাচ্ছে। এদের অপরাধের জন্য যদি অভিভাবকদের কাছে কেউ নালিশ করেন, তাহলে উল্টো আরও বেশি হয়রানি ও হামলার শিকার হতে হয়। এদের শেল্টার বা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এদের কাজে লাগানো হয়। এলাকায় প্রভাব সৃষ্টি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন—এসবের কাজে এরা নেতাদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যু কিশোর গ্যাংয়ের এই ভয়াবহতাকে সামনে এনে কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে আমাদের। কেন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর-তরুণরা? কেন তারা মাদকসেবন, ছিনতাই, অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে?
জবাব হলো—আইনশৃঙ্খলার অবনতি, নীতিহীন অপরাজনীতি, সর্বস্তরের দুর্নীতি এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়। শৈশব থেকেই শিশুদের ভালো কিছু শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বলা হচ্ছে, পরীক্ষায় পাস করা দরকার চাকরি পাওয়ার জন্য এবং টাকা রোজগারের জন্য। শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি হয় শুধু জিপিএ ফাইভ, চাকরি আর অনেক অনেক টাকা, তাহলে পরীক্ষা পাস না করে অন্যভাবেও যদি টাকা রোজগার করা যায়, তবে সমস্যা কী?—এমনটা ভাবছে কিশোররা। কষ্ট করে লেখাপড়া শিখে চাকরি? সে তো অনেক দূর! বরং উঠতি বয়সেই কয়েকজন পাতি নেতা ও এলাকার ‘বড়ভাই’য়ের সঙ্গে ঘুরেফিরে যদি হাতে টাকা পাওয়া যায়, তাহলে তো এই পথই সহজ। যখন একটি ছেলে ঘরে নতুন মোবাইল ফোন কিংবা মোটরসাইকেল নিয়ে আসছে, তখন বাবা-মা প্রশ্নও করছেন না—‘তুই এটা কেনার টাকা কোথায় পেলি?’ যেকোনো উপায়ে কিশোর ছেলে টাকা রোজগার করছে, এতেই অভিভাবকরা খুশি! সেই টাকা চাঁদাবাজি নাকি মাদক ব্যবসা থেকে আসছে, তা জানার আগ্রহ কারোর নেই। কারণ, অভিভাবকরা নিজেরাও নীতিহীন পথে টাকা উপার্জনে ব্যাকুল অথবা ব্যস্ত। সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতি, লোভ আর আদর্শহীনতা ছড়িয়ে পড়ার কারণেই শিশু-কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে অপরাধের সঙ্গে; তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
আরেকটি কারণ হলো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা। একটি অপরাধের শাস্তি না হওয়ায় আরেকটি অপরাধের জন্ম হয়। একজন অপরাধী যখন সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন তাকে দেখে আরও এক শ জন অপরাধীর জন্ম হয়। যদি এর আগে সংঘটিত সব কটি হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিচার হতো, অপরাধীদের কঠোর শাস্তি হতো, তাহলে সমাজে অপরাধ কমে যেত।
অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত তুহিন কিন্তু এর আগেও অন্য অপরাধ করেছে। তখন যদি তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হতো, তাহলে আজকের ঘটনাটি হয়তো ঘটত না। অসংখ্য বখাটে, বিপথগামী কিশোর-তরুণ বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় রয়েছে। এদের ছাড় দেওয়া মানেই হলো নতুন অপরাধ সংঘটনের পথ পরিষ্কার করা।
কিশোরদের বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন তাদের বিপথে নেওয়া অমানুষগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। অপরাজনৈতিক অন্ধকার বলয় থেকে তাদের বের করে আনা। ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে একেকটি দানব হয়ে ওঠা থেকে তাদের রক্ষা করা।
একসময় পাড়ায়-মহল্লায় ছিল পাঠাগার, ছিল সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠন। শিশু-কিশোররা একসময় স্কাউট আন্দোলনে জড়িত হতো। তারা পাড়ার সংগঠনের মাধ্যমে ফুটবল-ক্রিকেটের মতো খেলায় ব্যস্ত থাকত। শিশু একাডেমি একসময় জেলায় জেলায় শিশু-কিশোরদের জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। ছিল কলেজে ও জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতা। এগুলো শিশু-কিশোরদের ইতিবাচক বিনোদন দিত, তাদের দেশ গঠনের জন্য তৈরি করত।
অপরাজনীতি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। একসময় যে ক্লাবগুলো ছিল নির্মল বিনোদনের কেন্দ্র, সেগুলো পরে হয়ে দাঁড়ায় গুন্ডা, মাস্তান আর মাদকসেবীদের আখড়া। ছিনতাই, হয়রানি ইত্যাদি অপরাধে পুলিশ থাকে নিশ্চুপ; কারণ, এই সব ছিঁচকে অপরাধীদের পেছনে থাকে ক্ষমতাশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, যারা এলাকায় তাদের প্রভাব ধরে রাখতে ও সাধারণ মানুষের মনে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে সাহায্য করে।
আমাদের সমাজকে যদি কিশোর গ্যাং এবং অন্যান্য অপরাধ থেকে বাঁচাতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রকে কঠোর ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য সুস্থ বিনোদনের কথা ভাবতে হবে। পাঠাগার, ক্রীড়া সংগঠন, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার দিনগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে। মাদকের হাত থেকে কিশোর ও যুবসমাজকে বাঁচাতে হলে দেশে মাদক প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। এ-বিষয়ক কোনো রকম দুর্নীতিকে সহ্য করা চলবে না। দেশকে মাদকমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ করতে হবে, অপরাধমুক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকারকেই সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে হবে।
যেকোনো শিশু-কিশোর নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যার ঘটনাকে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে অপরাধীদের কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে।
অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের সমাজের গভীর ক্ষতস্থানকে সামনে এনেছে। আর যেন কোনো শিশু-কিশোর এভাবে মারা না যায়, আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন শূন্য না হয়।
শান্তা মারিয়া: শিক্ষক, বাংলাভাষা বিভাগ, ইউননান বিশ্ববিদ্যালয়, চীন। ইমেইল: shantamariavalia@gmail.com