শারীরিক বা মানসিক ভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ভয়ের কারণ নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে সাধারণত আলাদা হয়।
Published : 17 Sep 2026, 10:18 PM
অনেকেই সম্পর্কে জড়াতে চান, সঙ্গীর সান্নিধ্য পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও মনে লালন করেন; অথচ সম্পর্ক একটু গভীর হতে শুরু করলেই এক ধরনের অজানা আতঙ্কে পিছিয়ে যান। নিজের ভেতরের আবেগ, দুর্বলতা বা গোপন অনুভূতিগুলো সঙ্গীর সঙ্গে ভাগ করে নিতে গিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়েন।
মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় 'ফিয়ার অব ইন্টিমেসি' বা ঘনিষ্ঠতার ভয়। এই মানসিক টানাপোড়েন কোনো জটিল রোগ নয়, তবে তা সুন্দর একটি সম্পর্ককে নষ্ট করতে এবং জীবনে তীব্র একাকিত্ব ডেকে আনতে বড় ভূমিকা রাখে।
এই ভয়ের মূল উৎস এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের নিবন্ধিত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং 'কাম ডটকম'-এর প্রধান কর্মকর্তা ডা. ক্রিস মোসুনিক, ক্লিনিক্যাল পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন, এই ভয়ের মূল উৎস লুকিয়ে থাকে মানুষের অতীত অভিজ্ঞতা বা শৈশবের কোনো ট্রমা বা আঘাতের মাঝে।
অতীতে কোনো প্রিয় মানুষের কাছ থেকে পাওয়া বড় আঘাত, প্রতারণা বা পারিবারিক অবহেলা মানুষের মনে অবচেতনভাবেই এই ধারণার জন্ম দেয় যে— কাউকে খুব কাছে আসতে দিলে আবারও কষ্ট পেতে হবে।
এছাড়া বিখ্যাত জার্মান-আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ও উন্নয়নমূলক মনস্তত্ত্ববিদ এরিক এরিকসন, তার মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব 'ইন্টিমেসি বনাম আইসোলেইশন'-এ উল্লেখ করেছেন, ‘১৯ থেকে ২৯ বছর বয়সের তরুণদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা এবং একাকী থাকার ভয়ের মধ্যে একটি তীব্র দ্বন্দ্ব কাজ করে। এই বয়সে যারা এই মানসিক পর্যায়টি সফলভাবে পার করতে পারে না, তারা পরবর্তী সময়ে সম্পর্কে জড়াতে ভয় পায় এবং একাকিত্বে ভোগে’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘনিষ্ঠতার ভয় পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে।
সামাজিক কাঠামোর কারণে পুরুষেরা অনেক সময় আবেগ প্রকাশকে দুর্বলতা মনে করেন, ফলে তারা গভীর বা আবেগঘন মুহূর্তগুলোকে হাসির ছলে উড়িয়ে দেন বা অতিরিক্ত কাজের মাঝে নিজেকে ব্যস্ত রেখে মানসিক দূরত্ব বজায় রাখেন।
অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে এটি অনেক সময় অবহেলা বা প্রত্যাখ্যানের ভয় থেকে তৈরি হয়, ফলে তারা একটু বেশি ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত তৈরি হওয়ার পরপরই এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক আচরণ হিসেবে সম্পর্ক থেকে গুটিয়ে যান।
তবে আশার কথা হলো, সঠিক থেরাপি বিশেষ করে ‘কগনিটিভ-বিহেভিওরাল থেরাপি (সিবিটি)’ এবং ‘অ্যাটাচমেন্ট-বেইজড থেরাপি’র মাধ্যমে এই নেতিবাচক চিন্তাভাবনা ও শৈশবের মানসিক ক্ষত কাটিয়ে ওঠা পুরোপুরি সম্ভব।
সম্পর্কের এই দেয়াল ভাঙতে কানাডার ‘মাইন্ডফুলনেস’ বিশেষজ্ঞ ও সম্পর্কের আচরণ গবেষক তামারা লেভিট কয়েকটি সচেতন পদক্ষেপ ও 'কাইন্ড কমিউনিকেশন' বা দয়ালু যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
প্রথমত, সঙ্গীর সঙ্গে অস্বস্তি সত্ত্বেও নিজের অনুভূতিগুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে হবে। ছোটখাটো ব্যক্তিগত গল্প বা আবেগ ভাগাভাগি করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিশ্বাসের জায়গাটি মজবুত করা প্রয়োজন।
যদি শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় কোনো জড়তা থাকে, তবে শুরুতেই বড় কোনো প্রত্যাশা না রেখে হাত ধরা বা পাশাপাশি বসার মতো ছোট ছোট স্পর্শের মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনা দরকার।
এছাড়া মার্কিন চিন্তাবিদ ও লেখক জে শেঠি তার 'ট্রু রিফ্লেকশনস' অনুশীলনে দেখিয়েছেন, মানুষ যখন নিজের ভেতরের ভয়ের প্রকৃত কারণগুলো একাগ্রতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে পারে, তখন সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করা সহজ হয়।
যেকোনো সম্পর্কে গভীরতা রাতারাতি আসে না, তাই নিজের প্রতি এবং সঙ্গীর প্রতি ধৈর্যশীল হয়ে একসঙ্গে পথ চলাই হল এই ভয় জয় করার একমাত্র উপায়।