আমি যে ক্যাম্পে যোগ দেই তার ক্যাপ্টেন ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।
Published : 24 Dec 2025, 08:11 PM
একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান নওগাঁর রাণীনগরের তরুণ মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বাহাত্তর বছর বয়সী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় স্মরণ করেন সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর কথা।
হ্যালো: মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিনগুলো আপনার কেমন কেটেছিল?
মো. মোস্তাফিজুর রহমান: মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় ২৬শে মার্চ থেকে। রেডিও থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সংবাদ জানতে পারি। স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরাও তখন রাণীনগর দখল নিতে চলে আসে। আমাদের রাণীনগর রেলস্টেশনে ফায়ারিং হয়। আমরা তখন চকের পুল নামের একটি ব্রিজ ভেঙে দিই। এরপর পাকবাহিনী যখন নওগাঁ দখল করে নেয় তখন আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং আমি গ্রামে ফিরে আসি।
তারপর যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমার চাচাতো ভাই আনোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে মধুপুর ক্যাম্পে যাই। যেখানে আমরা প্রশিক্ষণ নিই। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট এলাকায় দুইটি ক্যাম্প ছিল। আমি যে ক্যাম্পে যোগ দেই তার ক্যাপ্টেন ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।
হ্যালো: কোন অনুপ্রেরণায় আপনি যুদ্ধে যোগ দেন?
মো. মোস্তাফিজুর রহমান: সে সময়ে আমরা ছিলাম তরুণ প্রজন্ম। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণ ও নিপীড়ন আমরা দেখেছি। আমরা বাঙালিরা অর্থাৎ তৎকালীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেও ক্ষমতা পায়নি। আমরা চিনি উৎপাদন করতাম কিন্তু আমাদের বাজারেই এর মূল্য আট আনা আর তাদের ওখানে চার আনা। বাঙালি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই বৈষম্য ছিল। এগুলো আমাদের ছাত্রদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। আমরা বুঝতে পারি তারা আমাদের শোষণ করছে। এরই প্রেক্ষিতে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।
হ্যালো: মুক্তিযুদ্ধের কোন ঘটনাটি আপনাকে এখনো কষ্ট দেয়?
মো. মোস্তাফিজুর রহমান: সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় যে, আমরা বেঁচে থাকলাম কিন্তু আমাদের ক্যাম্প ইনচার্জ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর আমাদের সামনেই শহীদ হন। তার লাশ আমরা শিবগঞ্জে সোনা মসজিদে দাফন করি। সেখানে আরেক আরেক বীরযোদ্ধা মেজর নজমুল হক সমাহিত আছেন। তারা দুইজনই শহীদ হয়েছিলেন কিন্তু আমরা বেঁচে আছি।
হ্যালো: যুদ্ধের সময় গ্রামের মানুষরা কীভাবে আপনাদের সাহায্য করতেন?
মো. মোস্তাফিজুর রহমান: তখন মনে হত যে, পুরো দেশবাসী আমরা একসঙ্গে যুদ্ধ করছি। আমরা ক্যাম্পে থাকতাম। সীমান্ত এলাকায় থাকতাম। গ্রামের মানুষেরা অনুসন্ধান করে পাওয়া নানা খবর আমাদের কাছে পৌঁছে দিত। আমাদের অনুসন্ধানের প্রয়োজন হত কম। পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান কোথায়, তারা কী করছে এই ধরনের সব খবরই তাদের মাধ্যমে পেতাম। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়াতেও সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক আগ্রহ কাজ করত।
হ্যালো: বিজয়ের দিনে আপনার অনূভুতি কেমন ছিল?
মো. মোস্তাফিজুর রহমান: আমরা তো ভেবেছি দেশ স্বাধীন করতে অনেক সময় লাগবে। ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ ঘোষণা এল যে, পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করছে। এমন খবরের পর আমরা আনন্দে উল্লাসে মুক্তিযোদ্ধারা সবাই একত্রিত হই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। যাদের নামে অস্ত্র ছিল তারা সবাই তা জমা দিয়ে দেই। বিজয়ের ১৫ দিন পরে আমি আমার নিজ গ্রামে নিজ বাড়িতে ফিরে আসি।
আমাদের চুল ছিল বড় বড়, কোমড়ে গামছা আর গায়ে গেঞ্জি এই পোশাক গুলো দেখেই সবাই বুঝে ফেলত আমরা মুক্তিযোদ্ধা। সাধারণ মানুষের সম্মান আর ভালোবাসা এনে দিয়েছিল আলাদা অনুভুতির।
রাজশাহী থেকে ট্রেন যোগে আসছিলাম রাণীনগর। আমার পোশাক দেখেই ট্রেনের দায়িত্ব থাকা ব্যক্তি আমাকে চিনতে পারে এবং আমার কাছে জানতে চায় আমি কোথায় যাব।
আমি বললাম রাণীনগর রেল স্টেশন। তিনি বললেন রাণীনগর স্টেশনেই কি? আমি বললাম রাণীনগর স্টেশনের দেড় কিলোমিটার আগে আমার বাড়ি। ট্রেনের দায়িত্বরত ব্যক্তি আমাকে দেড় কিলোমিটার আগেই নামিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এইটা আমার অনেক ভালো লেগেছে।
হ্যালো: সবশেষে শিশুকিশোরদের জন্য কী বলতে চান?
মো. মোস্তাফিজুর রহমান: এই প্রজন্মের শিশু কিশোরদের সৎ ও নির্ভীক হতে হবে। তাদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা থাকতে হবে। তারাই এখন দেশের সবকিছু দেখবে, দেশের উন্নয়নে তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা তো প্রায় শেষ, আমাদের যতটুকু করার ছিল করেছি আর তো কিছু করতে পারব না। তাদের দেশ দিয়েছি, পতাকা দিয়েছি। তারা দেশের পতাকা এবং দেশের মর্যাদা রাখবে।
প্রতিবেদকের বয়স: ১৭। জেলা: নওগাঁ।