'এত প্রাণ ঝরে যাওয়ার পরও মাতৃভাষার জায়গায় ভিনদেশি ভাষার প্রাধন্যটা মেনে নিতে অনেক খারাপ লাগে আমার।'
Published : 21 Feb 2026, 04:08 PM
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জী। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি। রাজশাহীতে যাদের নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তিনি ছিলেন তাদের একজন। সম্প্রতি হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় সেই সময়ের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন এই ভাষাসৈনিক।
হ্যালো: ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির দিন রাজশাহীতে কী হয়েছিল?
মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি: তখনকার যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের মত ছিল না। তখন ঢাকা থেকে রাজশাহীতে বিকেল বেলায় এক ট্রেন আসত। ২১ শে ফেব্রুয়ারির দিন বিকাল বেলাতেও সেই ট্রেনটি আসে। সে ট্রেনের একজন যাত্রী আমাদের কর্মী ছিল। তার কাছ থেকে জানতে পারি, ঢাকা রক্তে রঞ্জিত হয়েছে।
ভাষার দাবিতে অনেক মানুষ প্রাণ দিয়েছে। মুহূর্তেই আমরা খবরটি রাজশাহী কলেজের আবাসিক হলগুলোতে ছড়িয়ে দেই। কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসে জরুরি সভা ডাকা হয়। রাত প্রায় ১১টা পর্যন্ত চলে আলোচনা।

সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত হয় দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা হবে। পড়ে থাকা ইট-পাটকেল জোগাড় করে, কাদার গাঁথুনিতে ছাত্রাবাসের সামনেই আমরা একটি শহিদ মিনার তৈরি করি।
শেষ রাত পর্যন্ত পাহারাও দিই আমরা। কিন্তু সকালে পাক হানাদার বাহিনী এসে ভেঙে দেয় সেই মিনার। যেহেতু ওদের হাতে অস্ত্র ছিল তাই আমাদের কিছুই করার ছিল না। দূর থেকে দেখেছি শুধু এবং সেটিই ছিল দেশের প্রথম শহিদ মিনার। কিন্তু বারবার সরকারের কাছে দাবি জানালেও সেই স্বীকৃতি আজও মেলেনি।
হ্যালো: আপনারা কীভাবে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন?
মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি: একটা আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য যা যা করা দরকার আমরা তার সব করেছি। ঢাকায় যেসব সভা হয়েছিল আমরাও তা করেছি। নেতাকর্মীদের নিয়ে গোপনে অনেক আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনায় যোগ দিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা নেতাকর্মীরা রাজশাহীতে এসেছিল।
নেতাকর্মীর সঙ্গে আলোচনার পর বর্তমান ভুবন মোহন পার্কে এক জনসভার আয়োজন করা হয়। এই ঐতিহাসিক স্থানটি থেকেই সকল কর্মসূচির আয়োজন করা হত সেই সময়। কিন্তু এই পার্কটি এখন ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।
একবার এক মিছিল বের করা হয়েছিল যেখানে কল্পনা হলের মোড় থেকে ফায়ার সার্ভিসের মোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে মানুষের জনস্রোত নেমেছিল। এখন পর্যন্ত এটিই ছিল রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আন্দোলন।
হ্যালো: আন্দোলনের সময় আপনি কি কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন?
মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি: একবার আন্দোলনের সময় আমাকে ‘স্নাগলিং' (চোরাচালান) এর অভিযোগে ধরে নিয়ে যায়। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ১৪ নম্বর সেলে আমাকে তিন দিন বন্দি রাখা হয়েছিল।
হ্যালো: আমাদের সমাজের বর্তমান ভাষা পরিস্থিতির কোন বিষয়টি আপনাকে কষ্ট দেয়?
মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি: এত প্রাণ ঝরে যাওয়ার পরও মাতৃভাষার জায়গায় ভিনদেশি ভাষার প্রাধন্যটা মেনে নিতে অনেক খারাপ লাগে আমার।
প্রতিবেদকের বয়স: ১৭। জেলা: রাজশাহী।