'ঠিক তখনই ওরা এসে আমার স্বামীসহ ১৮৭ জনকে গুলি করে হত্যা করে।'
Published : 16 Dec 2025, 02:13 PM
১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী সোহাগপুর গ্রামে নেমে আসে ভয়াবহ এক নৃশংসতা। সেদিন পাক হানাদার বাহিনী তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার ও আল-বদরদের সহায়তায় প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে গ্রামজুড়ে তাণ্ডব চালায়। এ সময় তারা গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ১৮৭ জন পুরুষকে হত্যা করে। ওইদিন একসঙ্গে ৬২ জন নারী বিধবা হন এবং তাদের মধ্যে ১৪ জন পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। সেই ভয়াল ঘটনার পর থেকেই সোহাগপুর গ্রামটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘বিধবাপল্লী’ নামে। এই গ্রামেরই বাসিন্দা হাফিজা বেওয়া (৭০)। হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় দিনেগুলোর স্মৃতি তুলে ধরেছেন।
হ্যালো: মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি কোথায় ছিলেন? শুরুর দিনগুলো কেমন দেখেছিলেন?
হাফিজা বেওয়া: শুরুর দিকে যখন গোলাগুলি শুরু হয়, তখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের এলাকাতেই ছিল। কীভাবে তারা এখানে এল সেটা বলতে পারি না। তারা আসার সময় গ্রামের মানুষ কেউ হাল চাষ করছিল, কেউ রোয়া লাগাচ্ছিল, কেউ জালা ভাঙছিল। সবাই ভেবেছিল আমরা তো চোর-ডাকাত নই, আমরা কৃষক, আমাদের কেন মারবে? তাই মানুষ মাঠেই কাজ করছিল। ঠিক তখনই ওরা এসে আমার স্বামীসহ ১৮৭ জনকে গুলি করে হত্যা করে। কাউকে মাঠে, কাউকে আবার নিজ বাড়িতে ঢুকে গুলি করা হয়।
হ্যালো: স্বামীর মৃত্যুর পর আপনি কোথায় ছিলেন? সেই সময়টা কেমন কেটেছে?
হাফিজা বেওয়া: তখন খুব কষ্টের সময় গেছে। এমন সময়ও গেছে টানা আট দিন ভাত জোটেনি। কোনো খাবার ছিল না। লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। লবণের দাম বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন লবণ ছাড়া খাবার খেয়েছি।

হ্যালো: পাকিস্তানি সেনারা আর কীভাবে নির্যাতন করেছিল?
হাফিজা বেওয়া: অনেক মেয়েকে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল। অনেকে সেখানেই মারা গেছে। আমার জ্যৈষ্ঠ মাসে বিয়ে হয়েছিল, আর শ্রাবণ মাসের ১০ তারিখে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়। তখন স্বর্ণ সস্তা ছিল। বিয়ের সব গয়নাগাটিও মেরে লুট করে নিয়ে গেছে। আমার বুকে এখনও আঘাতের দাগ আছে। রাজাকার আর আল-বদররাই তো ওদেরকে নিয়ে আসছে, নইলে পাকিস্তানিরা আমাদের চিনত কীভাবে?
হ্যালো: বিজয়ের দিনের কোনো স্মৃতি কি মনে আছে? সেই দিনের অনুভূতি কেমন ছিল?
হাফিজা বেওয়া: বিজয়ের দিন আকাশে অনেক বিমান উড়ছিল, এইটুকুই শুধু মনে আছে। কয়েকদিন পর খবর পেয়ে আমরা বাড়ি ফিরি। কিন্তু তখন আর সেটা বাড়ি ছিল না, সব মরুভূমির মত হয়ে গিয়েছিল।
প্রতিবেদকের বয়স: ১৭। জেলা: শেরপুর।