“রাতে বাঙ্কারে বসে পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যস্ত রাখতে গোলাগুলি করতাম। একবার তারা এত কাছে চলে আসে যে আমাদের ধরে ফেলবে মনে হয়েছিল।”
Published : 22 Dec 2025, 05:56 PM
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর হামলার মুখে গাজীপুরের তরুণ মো. খোরশেদ হোসাইন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সীমান্ত এলাকায় অপারেশনে অংশ নেন এবং পরবর্তীতে দেশের ভেতরে বিভিন্ন যুদ্ধে যুক্ত হন। জেলার কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ গ্রামের ৭৬ বছর বয়সী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় একাত্তরের যুদ্ধদিন, প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা ও বিজয়ের স্মৃতি তুলে ধরেছেন।
হ্যালো: মুক্তিযুদ্ধের আগে আপনার জীবন কেমন ছিল?
মো: খোরশেদ হোসাইন: তখন আমি জগন্নাথ কলেজের বিএসসি ছাত্র ছিলাম। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অসহযোগ আন্দোলনের ডাক আসার পর কলেজ থেকেই সংগ্রাম শুরু করি। যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমে গ্রামে যাই। কিন্তু সেখানে নিরাপত্তার খুব অভাব ছিল। পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামে এসে ঘরবাড়িতে আগুন দিত, মানুষকে গুলি করত, বিশেষ করে কলেজ-ভার্সিটির ছাত্রদের ধরে ধরে হত্যা করত। পরে আমরা দলবেঁধে ভারতে চলে যাই ট্রেনিংয়ের জন্য। ত্রিপুরার আগরতলা হয়ে আমাদেরকে গেরিলা, কমান্ডো ও বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা হয়। ডিগ্রিধারী হওয়ায় আমাকে উত্তর প্রদেশের একটি গেরিলা ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হয়। ট্রেনিং শেষ করে দেশের ভেতরে ঢুকে পড়ি।
হ্যালো: যুদ্ধ শুরুর পর কোন ঘটনা আপনাকে সাহস দিয়েছে?
মো: খোরশেদ হোসাইন: এটি ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত। নির্বাচনে বাঙালিরা জয়ী হলেও পাকিস্তানি শাসকরা ক্ষমতা দেয়নি। তারা বাঙালিদের অযোগ্য, বর্বর বলে গালাগালি করত। এই অবমাননা ও বৈষম্য আমাদের ভীষণ ক্ষুব্ধ করে তোলে। তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিই আর এভাবে থাকা যাবে না। সেখান থেকেই যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করি।
হ্যালো: প্রশিক্ষণের দিনগুলো কেমন ছিল?
মো: খোরশেদ হোসাইন: ট্রেনিং ভালো ছিল। তবে সবচেয়ে কষ্ট হয়েছিল খাবারের জন্য। ভারত তখন খুব গরিব রাষ্ট্র। আমাদের এতগুলো মানুষকে যে কীভাবে খাওয়াইছে তা বলার মত না।
হ্যালো: সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল?
মো: খোরশেদ হোসাইন: খুব ভালো ছিল। আমরা সবাই শিক্ষিত ছিলাম এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিলাম। ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাঙালি ইনস্ট্রাক্টররা আমাদের সামরিক ও মোটিভেশনাল ট্রেনিং দিতেন। মেজর জেনারেল চৌহান রণকৌশল শেখাতেন। বাংলাদেশের নেতারাও রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ দিতেন। আমাদের বাংলাদেশের হাবিবুল্লাহ সাহাব ছিলেন। প্রয়াত নেতা। তিনিও আমাদের রাজনৈতিক ক্লাস নিতেন।
হ্যালো: যুদ্ধকালীন কোনো স্মৃতি কি এখনও ভুলতে পারেন না?
মো: খোরশেদ হোসাইন: সীমান্তে যুদ্ধের কথা আজও ভুলতে পারি না। রাতে বাঙ্কারে বসে পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যস্ত রাখতে গোলাগুলি করতাম। একবার তারা এত কাছে চলে আসে যে আমাদের ধরে ফেলবে মনে হয়েছিল। কিন্তু আমরা নিঃশব্দে বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকি, তারা আমাদের ওপর দিয়েই চলে যায়। পরে ঘোড়াশাল ও কাপাসিয়া এলাকায় অপারেশনে অংশ নিই। একবার পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের অবস্থান ঘিরে ফেললে আমরা ধানক্ষেতে লুকিয়ে পড়ি। ধরা পড়লে সেদিনই গুলি করে মারত এই ভয়টা এখনও মনে আছে। শেষে কাপাসিয়া ক্যাম্পে সবাই একত্রিত হয়ে সম্মিলিত আক্রমণ শুরু করি। ধীরে ধীরে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে। ১৫ ডিসেম্বর গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পতন হয়, পরদিন আসে চূড়ান্ত বিজয়।
হ্যালো: ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মুহূর্তে আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?
মো: খোরশেদ হোসাইন: সে সময়টা ছিল আনন্দ-উৎসবের। আমরা আকাশে বনফায়ারিং করেছিলাম। পরে কমান্ডাররা সতর্ক করেন যেন দুর্ঘটনা না ঘটে। ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে পল্টন ময়দানে অস্ত্র জমা দিই। তখনই নিশ্চিত হই যে, দেশ সত্যিই স্বাধীন।
হ্যালো: দেশের শিশু-কিশোরদের জন্য আপনার বার্তা কী?
মো: খোরশেদ হোসাইন: মানুষ আমাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান করে। কেউ কেউ আবার প্রশ্ন করে যে পাকিস্তান কেন ভাগ করলেন। তারা আবার সম্মান করে না। কিন্তু বাকি প্রায় সবাই আমাদেরকে সম্মান করে। জোর করে সম্মান নেওয়া যায় না। তোমরা নিজে থেকে যে যা সম্মান করবে তাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
প্রতিবেদকের বয়স: ১৬। জেলা: গাজীপুর।