এসব ঘটনায় এআই প্রযুক্তির সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে বিভক্তি আরও প্রকট হয়ে উঠল।
অল্টম্যান বলেছেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ও উদ্ভাবন প্রক্রিয়াকে ‘ধীর না করে’ তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতারা হিমশিম খাচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স
Published : 16 Sep 2026, 07:48 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে জনমনে ক্রমাগত উদ্বেগের মধ্যেই ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান বলেছেন, প্রযুক্তিটিকে নিরাপদ রাখতে শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোর ওপর মানুষের আস্থা রাখা উচিত।
স্যান ফ্রান্সিসকোতে এক সম্মেলনে অল্টম্যান বলেছেন, “বিশ্বের আমাদের ওপর ভরসা রাখা উচিত যে, আমরা সঠিক কাজটিই করব। কারণ আমরা বিষয়টির গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করছি।”
বিবিসি লিখেছে, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে মানুষের উদ্বেগকে যৌক্তিক বলেও স্বীকার করেছেন অল্টম্যান।
সমালোচকরা বলছেন, নিজ উদ্যোগে এআই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন এআই কোম্পানির ওপর পুরোপুরি ভরসা করা যায় না।
প্রগতিশীল মার্কিন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননসহ অনেকেই এআইয়ের ওপর আরও কঠোর প্রশাসনিক তদারকির দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, দ্রুত গতিশীল এ প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বসানোর যে কোনো দাবির শুরু থেকেই সমালোচনা করে আসছেন স্বয়ং ডনাল্ড ট্রাম্প।
এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের ভয়ভীতিকে ‘ধাপ্পাবাজি’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘এআইয়ের জন্য একমাত্র প্রয়োজনীয় ‘গার্ডরেল’ একজন শক্তিশালী ও বিচক্ষণ প্রেসিডেন্ট’।
সফটওয়্যার নির্মাতা কোম্পানি ‘সেলসফোর্স’-এর বার্ষিক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় অল্টম্যান বলেছেন, “প্রযুক্তিটি কোথায় ভুল দিকে মোড় নিতে পারে তা কল্পনা করার জন্য আগের চেয়ে এখন খুব বেশি কল্পনার প্রয়োজন হয় না। আমার মনে হয়, এআইকে ভয় পাওয়ার পেছনে বিশ্বের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।”
তবে দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যে বেশ কঠিন হতে পারে তা এআই প্রধানরাও স্বীকার করেছেন।
৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশ পাওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘অ্যাক্সিওস’কে অল্টম্যান বলেছেন, ২০২৩ সালে কংগ্রেসের সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার পর তিনি আশা করেছিলেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা উন্নত এআইয়ের জন্য ‘মৌলিক কাঠামো’ তৈরি করবেন, যা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
অল্টম্যান ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ও উদ্ভাবন প্রক্রিয়াকে ‘ধীর না করে’ তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতারা হিমশিম খাচ্ছেন।
মার্কিন আইনপ্রণেতারা গ্রীষ্মকালীন ছুটির পর কাজে ফিরলেও এআই নিয়ে নতুন কোনো নিরাপত্তা আইন সহসা পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম। মার্কিন দলগুলোর মধ্যে কীভাবে এই প্রবিধান তৈরি হবে তা নিয়ে মতৈক্যের অভাব রয়েছে।
গেল সপ্তাহে অ্যানথ্রপিকের এক গবেষকের পদত্যাগ ও তার একটি ভাইরাল পোস্টের পর এটাই ছিল অল্টম্যানের প্রথম বক্তব্য। অ্যানথ্রপিকের ওই গবেষক দাবি করেছিলেন, এআই অনিয়ন্ত্রিত থাকলে এ দশকের শেষ নাগাদ তা ‘সব মানুষকে মেরেও ফেলতে পারে’।
এরপর গুটি কয়েক এআই নির্বাহী ও বিশেষজ্ঞ এ মূল্যায়নের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তবে কীভাবে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বা এআই ঠিক কীভাবে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত কিছু জানাননি।
অল্টম্যানের মন্তব্যের পর মেটা প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, প্রতিটি এআই কোম্পানিরই নিরাপত্তার স্বার্থে ‘নিজ নিজ পদক্ষেপ নেওয়ার’ মতো সক্ষমতা ও আগ্রহ রয়েছে।
তিনি লিখেছেন, “যেসব ল্যাব এলাইনমেন্ট বা সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে না তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। তাদের মডেলগুলোর কারণে কোনো ধরনের ক্ষতি হলে ল্যাবগুলোকে বড় ধরনের আইনি দায়ভার নিতে হয়। ফলে তা ঠেকানোর তাগিদও তাদের রয়েছে।”
এসব ঘটনায় এআই প্রযুক্তির সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে বিভক্তি আরও প্রকট হয়ে উঠল।
একদল প্রযুক্তিপ্রধান নিজ উদ্যোগে এআই নিরাপদ রাখার পক্ষে মত দিলেও অন্য পক্ষ এর কঠোর সরকারি ও আইনগত তদারকির দাবি জানিয়েছে।
স্যান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং বলেছেন, নতুন সংস্করণের এআই চালু করা উচিত কি না সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কোম্পানিগুলোর নিজের হাতেই থাকা উচিত এবং বাইরে থেকে এর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা ঠিক নয়।
বর্তমানে বাজারদরের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানিটির প্রধান দাবি করেছেন, “আমাদের নতুন কোনো আইন বা প্রবিধানের প্রয়োজন নেই।” উদ্ভাবনের গতি ও নিরাপত্তার মধ্যে কোনো ‘ভুল বা কৃত্রিম বাছবিচার’ থাকা উচিত নয়।
হুয়াংয়ের ভাষ্য, নিরাপত্তা একটি ‘প্রকৌশলগত সমস্যা’ এবং কোনো পণ্যের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেললে কোম্পানিগুলোরই স্বেচ্ছায় ‘বিরতি নেওয়া’ উচিত।
ওপেনএআই প্রধান অল্টম্যানও আত্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, এআই কোম্পানিগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
“আমরা বিষয়টি ঠিকঠাক সামলে নেব। যদি কোনো কোম্পানি সক্ষমতার চেয়ে এআইয়ের সুরক্ষা এগিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয় তবে তারা নিজেরাই এর গতি মন্থর বা বন্ধ করে দেবে।”
তবে প্রযুক্তি শিল্পের এ স্ব-নিয়ন্ত্রণ ধারণার তীব্র সমালোচনা করেছেন অনেকে।
মার্কিন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও সাবেক হোয়াইট হাউসের কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন বলেছেন, এআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বিশ্বের মুষ্টিমেয় কিছু বিত্তশালীর হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয় এবং মানুষ এসব প্রযুক্তি মোড়লদের ওপর ভরসা করতে পারে না।
অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, এআইকে ‘সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত শিল্প’ হিসেবে ছেড়ে দেওয়া মানে বড় ঝুঁকির মুখে পাশা খেলার শামিল।
একই সুর শোনা গেছে ‘লজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স’-এর চিফ অপারেটিং অফিসার প্যাট্রিক হিলম্যানের মুখেও। তার ভাষ্য, ওয়াশিংটন বা সিলিকন ভ্যালি উভয় কোম্পানির ওপরই মানুষের আস্থার সংকট রয়েছে।
“আপনারা যা তৈরি করছেন তা যদি আসলেই বিপজ্জনক বলে বিশ্বাস করেন তবে দেখান কোন কাজগুলো বন্ধ করতে আপনারা প্রস্তুত আছেন।”
আধুনিক এআইয়ের অগ্রদূত ও গবেষক ইয়োশুয়া বেঙ্গিও এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেছেন, এআইয়ের মারাত্মক ঝুঁকিগুলো এড়াতে মুনাফাকেন্দ্রিক খাতের বাইরে গিয়ে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এর আগে, অ্যানথ্রপিক প্রধান আমোদেই শিল্পের গতি কমিয়ে আনতে ও সরকারকে এই খাতের তদারকি করার আহ্বান জানালে ওপেনএআইওয়ের অল্টম্যান, গুগল ডিপমাইন্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস ও ইলন মাস্ক তা সমর্থন করেছিলেন।
তবে পরবর্তীতে স্ব-নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নিলেন অল্টম্যানসহ অন্যান্যরা।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ নির্বাহীরা বলেছেন, তারা এরইমধ্যে একটি শিল্পভিত্তিক নিরাপত্তা চুক্তির দিকে এগোচ্ছেন।
আমোদেই বলেছেন, নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করতে তারা অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে কথা বলছেন।
ওপেনএআইয়ের নির্বাহী ক্রিস লেহান বলেছেন, সরকারি সহায়তা থাকুক বা না থাকুক শীর্ষ এআই ল্যাবগুলো এখন স্বেচ্ছাসেবী প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুরক্ষা মান উন্নত করতে কাজ করছে।
“বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা নিখুঁত করার প্রচেষ্টাকে ভালো কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে দিতে পারি না।”