মাইক্রোফোনের সামনে ইনসাফের বুলি কি তবে ক্যামেরার পেছনের কসাইখানার নির্মমতার কাছে হেরে যাচ্ছে?
Published : 16 Sep 2026, 08:40 AM
রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে কত ধরনের নায়ক আসে! কেউ বিপ্লবী, কেউ গণঅভ্যুত্থানের বীর, কেউ আবার ফেইসবুকের ক্যামেরা অন হলেই চে গেভারা। কিন্তু সমকালীন রাজনীতিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর আবির্ভাব যেন আলাদা ঘরানার। তিনি রাজনীতির সঙ্গে এমন কিছু উপাদান মিশিয়েছেন, যা এতদিন রাজনৈতিক অভিধানে ছিল না: ছাগল, বটি, ধারালো ছুরি এবং বিপ্লবী ভাব।
অনুসারীদের চোখে তিনি বেপরোয়া। আর নিজের প্রচারে তিনি যেন এমন এক রাজনৈতিক চরিত্র, যিনি নিয়মকানুনকে পাত্তা দেন না, লজ্জাকে ভয় পান না, আর বিতর্ককে মনে করেন ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ।
সমস্যা হলো, এই বাহাদুরি যখন একজন শিশুর কান্না আর একটি অবোধ প্রাণীর যন্ত্রণার সঙ্গে মিশে যায়, তখন সেটি আর ‘বেপরোয়া রাজনীতি’ থাকে না। তখন সেটি হয়ে ওঠে রুচির অধঃপতনের এক অদ্ভুত প্রদর্শনী। আরও ভয়ঙ্কর হলো, সেই প্রদর্শনীতে যখন কেউ কেউ হাততালি দিতে শুরু করে, তখন বুঝতে হয় সমস্যাটি শুধু একজনের নয়, রাজনৈতিক রুচিরও।
ঘটনাটি শুনলে প্রথমে মনে হতে পারে, এ বুঝি কোনো আজগুবি রাজনৈতিক কৌতুক। সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বাসা থেকে একটি ছাগল চুরি হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই ছাগল পরে জবাই করে খাওয়া হয়েছে এবং ভোঁতা বটি দিয়ে জবাই করতে ছাগলটিকে কঠিন যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে আসিফ নজরুল যখন টকশোতে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বর্ণনা দিয়েছেন, সেটা শুনলে যে কারোর মন খারাপ হবে, কান্না পাবে।
কিন্তু অনেককে দেখেছি, সেই সাক্ষাৎকারের নিচে হাসির ইমোজি দিতে! এই মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনায় হাসির জায়গাটা কোথায়, সেটাই খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ গল্পের কেন্দ্রে ছাগলটি শুধু একটি ছাগল নয়। সেখানে আছে একটি নয় বছরের শিশুর আবেগ। যে শিশুর কাছে ছাগলটি ছিল খেলার সঙ্গী, বন্ধুর মতো। যে শিশু নিজের মোবাইল ফোনে মা-বাবার ছবির বদলে সেই প্রাণীটির ছবি রেখে দেয়, তার কাছে সেটি কসাইখানার মাংস নয়, একটি সম্পর্ক।
একজন প্রাপ্তবয়স্কের কাছে যে প্রাণীটি খাদ্য হতে পারে, একটি শিশুর কাছে সেটিই হয়তো তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। এই সহজ সত্যটুকু বোঝার জন্য কোনো রাজনৈতিক দর্শনের বই পড়তে হয় না। শুধু মানুষ হওয়াটাই যথেষ্ট।
আর এখানেই রাজনীতির তথাকথিত বীরত্বের সঙ্গে মানবিকতার পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে রান্নাঘরের ভোঁতা বটি দিয়ে ছাগলটির গলা কাটার চেষ্টা হলো। বটি যথেষ্ট কার্যকর না হওয়ায় ধারালো ছুরি বা বটি আনার ব্যবস্থা করা হলো। অর্থাৎ প্রাণীটি যন্ত্রণায় ছটফট করছে, আর মহামান্য বিপ্লবীদের অপারেশন চলছে: ‘বটি কাজ করছে না, ধারালো বটি আন।’
রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক অস্ত্রের গল্প আছে। তলোয়ার, বন্দুক, কামান, মেশিনগান। কিন্তু ‘বিপ্লবী বটি’ হয়তো নতুন সংযোজন। আগামী দিনের রাজনৈতিক গবেষকরা হয়তো লিখবেন, এই উপমহাদেশের বিপ্লবী অস্ত্রভাণ্ডারে একসময় লাল পতাকার পাশাপাশি রান্নাঘরের বটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
হয়তো কোনো এক ক্লাসরুমে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক প্রশ্ন করবেন, “বিপ্লব সফল করার প্রাথমিক শর্তগুলো কী কী?”
শিক্ষার্থীরা তখন সমস্বরে উত্তর দেবে: “প্রথমত একটি ছাগল, দ্বিতীয়ত একটি ভোঁতা বটি, এবং চূড়ান্তভাবে একটি ধারালো বটি!”
যখন ছাগল জবাই হয়ে বিপ্লবীদের উদরস্থ হয়ে গিয়েছে, সেই সময় একটি শিশু তার প্রিয় প্রাণীটির জন্য কাঁদছে। একদিকে শিশুর শোক, অন্যদিকে ছাগলের মাংসভক্ষণ। কী অসাধারণ বৈপরীত্য! রাজনীতির দর্শন যদি এতটাই উন্নত হয় যে কারোর বাড়ির ছাগল চুরি করে খাওয়াকে রাজনৈতিক স্টান্ট হিসেবে চালানো যায়, তাহলে সত্যিই আমাদের রাজনৈতিক চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এতদিন ভাবতাম রাজনীতিতে ইশতেহার লাগে। এখন বুঝছি, সঙ্গে একটা ধারালো বটিও লাগতে পারে।
শিশুর মনস্তত্ত্ব অবশ্য এসব বোঝে না। একটা পুতুল হারালেও শিশু অনেক সময় নতুন পুতুলে খুশি হয় না। সে সেই পুরোনো পুতুলটিই চায়। কারণ পুতুলটি তখন আর পুতুল থাকে না, হয়ে ওঠে স্মৃতি, সঙ্গী, ভালোবাসার বস্তু। পোষা প্রাণীর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। মানুষ সেখানে একটি প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে।
কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতির কিছু সৈনিকের কাছে এসব সম্ভবত নিছক ‘সেন্টিমেন্টাল ন্যাকামি’। রাজনৈতিক মতভিন্নতা দেখা দিলে নিজের পক্ষের লোকজনকেও শিক্ষা দিতে হবে। তার ছাগলটা নিয়ে এসো। রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে হবে? ছাগলের মাংস খেয়ে দাও। তারপর ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে এমন মুখ করো, যেন সদ্য কোনো সাম্রাজ্য জয় করে ফিরেছ।
এর চেয়ে সহজ রাজনৈতিক দর্শন আর কী হতে পারে?
আসিফ নজরুল ছাগল চোরের কোনো নাম বলেননি। তিনি নাম না বললেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম নিতে কসুর করেনি। পাটওয়ারী নিজে ছাগল চুরি করেছেন এমনটা বলেননি। তবে তিনি তা জানতেন বলে নির্বিকারভাবে ঘোষণা করছেন। শুধু তাই নয়, যারা ছাগল চুরি করেছেন, তারা একটির পরিবর্তে দুটি ছাগল চুরি করেননি বলে তাদেরকে ধিক্কার জানিয়েছেন।
বাহ! এ যেন অপরাধবোধেরও গণতান্ত্রিক সংস্করণ: একটা কেন, দুটোই হওয়া উচিত ছিল!
অপরাধের পর মানুষ সাধারণত ক্ষমা চায়, ব্যাখ্যা দেয়, অনুতপ্ত হয়। এখানে যদি উল্টো অপরাধের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব আসে, তাহলে সেটি শুধু রসিকতা নয়, মানসিকতারও একটি নমুনা। এই যুক্তি রাজনীতিতে নতুন আতঙ্ক তৈরি করে। কারও সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ? তার বাড়ির হাঁসটা নিয়ে যান। মতবিরোধ আরও গভীর? মুরগিটা নিন। সম্পর্ক একেবারে তলানিতে? গরুটার দিকে নজর দিন। আর সবশেষে সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিন, ‘একটা খেয়েছি, আরও খাওয়া উচিত ছিল।’
এভাবে চললে একদিন হয়তো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে বাজারের কসাইয়ের তালিকার কোনো পার্থক্য থাকবে না।
অবশ্য বিষয়টি কেবল ছাগল চুরি বা ছাগল খাওয়ার নয়। আসল প্রশ্ন হলো মানসিকতা। মতভিন্নতাকে দমন করার রাজনৈতিক পদ্ধতি কী? যুক্তি দিয়ে? ভোটে? জনসমর্থন দিয়ে? নাকি তার ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে তাকে অপমান করে, তার প্রিয় জিনিস কেড়ে নিয়ে, তারপর সেটিকে নিয়ে প্রকাশ্যে বাহাদুরি করে?
প্রথম পদ্ধতিটিকে বলে গণতন্ত্র। দ্বিতীয়টি প্রতিহিংসা। পাটওয়ারী অবশ্য সংসদ নির্বাচনের সময় এই দুটির দারুণ মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। ধারণা করা যায়, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এই মেলবন্ধনটা আরও ভালোভাবে ঘটাতে পারবেন তিনি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) মেয়র পদে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে এবং দক্ষিণ সিটিতে (ডিএসসিসি) নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপি।
রাজনীতি যখন প্রতিহিংসার আনন্দে পরিণত হয়, তখন আজ ছাগল থাকে, কাল থাকে ঘরবাড়ি, পরশু সম্পদ, তার পরদিন মানুষ। ইতিহাসে ক্ষমতার রাজনীতি কখনোই এক লাফে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জায়গায় পৌঁছায় না। ছোট ছোট নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক করে তুলতে তুলতেই বড় নিষ্ঠুরতার জন্য সমাজকে প্রস্তুত করা হয়।
প্রথমে মানুষ বলে, ‘আরে, একটা ছাগলই তো!’ তারপর বলে, ‘এতে এত কথা বলার কী আছে?’ তারপর একদিন বুঝতে পারে, ছোট নিষ্ঠুরতাগুলোই বড় নিষ্ঠুরতার মহড়া ছিল। আর এখানেই ছাগল কাণ্ডের হাস্যকর দিকটি ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
আরেকটি প্রশ্নও আসে। যারা ধর্ম, ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ নিয়ে বক্তৃতা দেন, তাদের রাজনৈতিক আচরণে সেই মানবিকতার প্রতিফলন কোথায়? রাজনীতির মঞ্চে অবশ্য বক্তৃতা দেওয়া খুব সহজ। ইনসাফের কথা বলা সহজ। বিপ্লবের কথা বলা আরও সহজ। ক্যামেরার সামনে বুক ফুলিয়ে ‘আমি কাউকে ভয় করি না’ বলা সবচেয়ে সহজ। কঠিন হলো নিজের রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা।
আসিফ নজরুলের নীতি বা রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা যে কেউ করতে পারেন। তার বিরুদ্ধে যুক্তি দাঁড় করানো যায়, তার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা যায়, তার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। গণতন্ত্রে এসবের সবই বৈধ। কিন্তু কারও সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ আছে বলে তার বাড়ির প্রাণী চুরি করে নিয়ে গিয়ে জবাই করা, তারপর সেটি নিয়ে গর্ব করা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ হতে পারে না। আর প্রতিহিংসার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সে কখনো এক জায়গায় থামে না। আজ ছাগল-কাণ্ড, কাল তবে কী?
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: chiros234@gmail.com