ব্রিকস হয়তো সহসাই ডলারের সিংহাসন দখল করবে না, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে যেখানে একটি মাত্র মুদ্রার রাজত্ব আর থাকবে না।
নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন একক মুদ্রার পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের ওপর জোর দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে বহুমুদ্রা ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছে।
Published : 17 Sep 2026, 03:02 PM
বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালে তার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা যায় অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কূটনীতিতে। একসময় আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব ছিল প্রায় একচ্ছত্র। কিন্তু চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার উদীয়মান অর্থনীতির উত্থান ওই কাঠামোকে বহুকেন্দ্রিক করে তুলছে। এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হলো ব্রিকস। ১২–১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ওই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ব্রিকস কি ডলারের বিকল্প একটি নতুন মুদ্রাব্যবস্থা তৈরি করছে, নাকি বিশ্ব অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে বহুমুদ্রা ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
ব্রিকস নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো ডি-ডলারাইজেশন বা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো। কিন্তু ডি-ডলারাইজেশনকে যদি ডলারকে সরিয়ে একটি নতুন মুদ্রা বসানো হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ব্রিকসের বর্তমান কৌশলের ভুল ব্যাখ্যা হবে।
নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে ব্রিকসের অর্থ পরিশোধ বিষয়ক কর্মীবাহিনীকে আন্তঃসীমান্ত অর্থ পরিশোধ ও বার্তা আদান-প্রদান ব্যবস্থার পারস্পরিক সংযোগ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সদস্যদেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যটি ডলার থেকে ব্রিকসের একক মুদ্রায় রূপান্তর নয়; বরং শুধু ডলারনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বহুমুদ্রাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যে রুপি ও রুবল, চীন-রাশিয়া বাণিজ্যে রেনমিনবি বা ইউয়ান ও রুবল এবং বিভিন্ন ব্রিকস দেশের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের উদ্যোগগুলো এই পরিবর্তনের উদাহরণ। এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারকে বাধ্যতামূলক মধ্যবর্তী মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার না করা।
এর অর্থনৈতিক যুক্তি খুব পরিষ্কার। দুটি দেশের মধ্যে যদি সরাসরি স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি করা যায়, তাহলে প্রতিটি লেনদেনে প্রথমে স্থানীয় মুদ্রা ডলারে এবং পরে ডলার থেকে অন্য স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরের প্রয়োজন কমে। এতে লেনদেনের খরচ এবং মুদ্রা রূপান্তরের ঝুঁকি কমতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে ভূরাজনৈতিক কারণ। ডলারনির্ভর আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধ অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অনেক বেশি। ফলে রাশিয়া, ইরানসহ কিছু দেশের জন্য বিকল্প অর্থ পরিশোধের পথ তৈরি করা শুধু অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও বিষয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্রিকস ডলারভিত্তিক ব্যবস্থা রাতারাতি ধ্বংস করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে ডলারের অংশ গত কয়েক দশকে কমেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে ঘোষিত বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে ডলারের অংশ ছিল ৫৭.৭৪ শতাংশ; ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে তা ছিল ৫৬.৭৭ শতাংশ। একই সময়ে ইউরোর অংশ ছিল প্রায় ২০.২৫ শতাংশ এবং চীনা রেনমিনবির অংশ মাত্র ২ শতাংশ।
অর্থাৎ ডলারের অংশ কমেছে, কিন্তু ওই জায়গা কোনো একক প্রতিদ্বন্দ্বী মুদ্রা দখল করেনি। বরং বিভিন্ন মুদ্রা এবং সোনাসহ অন্যান্য সম্পদে বৈচিত্র্যতা এসেছে। এখানে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার: বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে ডলারের অংশ কমা আর আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের গুরুত্ব কমা এক কথা নয়। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, বৈদেশিক ঋণ, পণ্যবাজার, বিনিয়োগ ও মার্কিন আর্থিক বাজারে ডলার এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে সহসাই ডলারের পতন হবে, এমন সম্ভাবনা নেই।
ব্রিকসের আসল শক্তি কোথায়?
ব্রিকসের শক্তি শুধু তার মোট দেশজ উৎপাদন বা জনসংখ্যায় নয়; বরং সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমাগত বাড়ছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্রিকস সদস্যদেশগুলোর নিজেদের মধ্যে পণ্যবাণিজ্য ১৩ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০২৪ সালে তা প্রায় ১.১৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের জন্য প্রথম শর্ত হলো পর্যাপ্ত আন্তদেশীয় বাণিজ্য। ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য যত বাড়বে, ডলারকে মধ্যবর্তী লেনদেনের মুদ্রা হিসেবে বাদ দেওয়ার অর্থনৈতিক প্রণোদনাও তত বাড়বে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)। ২০২৪ সালে এনডিবির অনুমোদিত অর্থায়নের ৪৩.৫ শতাংশ সদস্যদেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রায় নির্ধারিত ছিল। একই বছরে ব্যাংকটির অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মোট অর্থমূল্য ছিল প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার। এখানেই ব্রিকসের বাস্তব অগ্রগতি সবচেয়ে স্পষ্ট। তারা এখনো নতুন বৈশ্বিক মুদ্রা তৈরি করতে পারেনি, কিন্তু বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো তৈরির কাজ করছে।
একটি অভিন্ন মুদ্রা চালু করতে হলে সদস্যদেশগুলোর মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, বিনিময় হার, পুঁজির সঞ্চালন, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপক সমন্বয় প্রয়োজন। ইউরোর ক্ষেত্রেও বহু বছরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক একীভবন প্রয়োজন হয়েছিল।
ব্রিকসের বাস্তবতা আরও জটিল। চীন ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। সদস্যদের অর্থনৈতিক কাঠামো ভিন্ন। প্রতিটি দেশের নিজস্ব মুদ্রানীতি ও জাতীয় স্বার্থ রয়েছে। চীনা ইউয়ানকে ডলারের জায়গায় বসানোও ব্রিকসের জন্য সহজ কাজ নয়। বরং ভারতের মতো দেশ একটি নতুন একক মুদ্রানির্ভরতা তৈরি করতে চাইবে না। এ কারণে বর্তমান ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত, যেখানে রুপি, রেনমিনবি, রুবল, দিরহাম, রিয়ালসহ বিভিন্ন স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার ও অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার সংযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
বহুমুদ্রাভিত্তিক বিশ্বের ভবিষ্যৎ কী?
ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থা সম্ভবত এমন হবে না যেখানে ডলার সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাবে। বরং ডলারের পাশাপাশি ইউরো, রেনমিনবি এবং অন্যান্য মুদ্রার ভূমিকা বাড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অধিক বৈচিত্র্যতা আনবে, সোনার গুরুত্বও বাড়বে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের মডেলটি হবে ডলার থাকবে প্রধান ব্যবস্থা হিসেবে, এর সঙ্গে যুক্ত হবে বৈচিত্র্যপূর্ণ মুদ্রা ও বহুকেন্দ্রিক মুদ্রাব্যবস্থা। এই পরিবর্তন ধীর হবে, কারণ মুদ্রাব্যবস্থা শুধু বাণিজ্যের বিষয় নয়; এটি আস্থা, আর্থিক বাজার, আইনি কাঠামো, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং এবং ভূরাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত।
ব্রিকসের সীমাবদ্ধতাও কম নয়। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সমন্বিত অর্থনৈতিক ইউনিয়ন নয়। সদস্যদের জাতীয় স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী। চীন-ভারত প্রতিযোগিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান-সৌদি সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদস্যদের ভিন্নতর সম্পর্ক; সবকিছুই ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে সীমিত করে। তবে এখানে ব্রিকসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যও বিদ্যমান, ঐক্যবদ্ধ মতাদর্শের পরিবর্তে অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতার মডেল। ১৮তম সম্মেলনের ঘোষণায় স্থানীয় মুদ্রা ও আন্তঃসীমান্ত অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার পারস্পরিক সংযোগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি।
ব্রিকস ক্রমশ এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে চাইছে যেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার জন্য প্রতিটি দেশকে সবসময় ডলারের ওপর নির্ভর করতে হবে না। ফলে আসল পরিবর্তনটি ডলার বনাম ব্রিকস নয়; পরিবর্তনটি হলো একক-মুদ্রাকেন্দ্রিক বিশ্ব থেকে বহুমুদ্রাভিত্তিক বিশ্বে উত্তরণ। ডলার আগামী দিনেও বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে থাকবে। কিন্তু তার একচ্ছত্র অবস্থান ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ব্রিকস ওই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
ব্রিকসের এই অভিযাত্রায় বাংলাদেশের মতো দেশের শিক্ষা হলো, ডলারবিরোধী হওয়া নয়, বরং অতিরিক্ত ডলারনির্ভরতা কমানো। পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই চীন, ভারত, রাশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন পথ তৈরি করা। বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত নীতি হবে বহুমুখী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ঢালাও ডলারবিরোধী অবস্থান নয়।
ব্রিকস হয়তো সহসাই ডলারের সিংহাসন দখল করবে না, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে যেখানে একটি মাত্র মুদ্রার রাজত্ব আর থাকবে না। বরং একাধিক মুদ্রা ও আর্থিক কেন্দ্র পাশাপাশি অবস্থান করবে।
ড. মঞ্জুরে খোদা লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: torikbd@gmail.com