Hello
UNICEF
  • হোম
  • হ্যালো
  • খবরাখবর
  • অন্য চোখে
  • আমার কথা
  • কথায় কথায়
  • ছবির ভাষা
  • সব খবর
English English
  • হোম
  • হ্যালো
  • খবরাখবর
  • অন্য চোখে
  • আমার কথা
  • কথায় কথায়
  • ছবির ভাষা
  • সব খবর
মতামত

জিন্নাহপ্রীতি-২: বিতর্কিত সেই ভাষণ ও ভাষা আন্দোলনের বীজবপন

১৯৪৮ সালে জিন্নাহর করাচি ফিরে যাওয়া দিয়েই কি ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছিল? নাকি কার্জন হলের ‘নো নো’ স্লোগানই ঠিক করে দিয়েছিল বাঙালির স্বাধিকারের লড়াই?

জিন্নাহপ্রীতি-২: বিতর্কিত সেই ভাষণ ও ভাষা আন্দোলনের বীজবপন

রাজু নূরুল রাজু নূরুল

Published : 16 Sep 2026, 10:54 AM

Updated : 16 Sep 2026, 10:54 AM

এ বছর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এসে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো—তার অনুসারীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, ১৯৪৮ সালে মৃত্যুবরণ করা একজন ব্যক্তির ওপর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের দায় অযথা চাপানো হচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জিন্নাহর কোনো সম্পর্কই ছিল না; তিনি এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নির্দোষ।

বিষয়টি কি আসলেই এত সরল? ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক ঠিক কী ছিল? তিনি কি ১৯৪৮ সালে, মৃত্যুর কয়েক মাস আগে বাংলা ভাষার প্রশ্নে শুধুই একটি বিতর্কিত অবস্থান নিয়েছিলেন, নাকি তার সেই অবস্থানের সঙ্গে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের কোনো যোগসূত্র ছিল? সেই ইতিহাস মীমাংসিত, তবু একটু খুঁড়ে দেখা দরকার, অন্তত হঠাৎ জেগে ওঠা জিন্নাহপ্রীতির এই সময়ে।

১৯৪৭ সালের ১৪ অগাস্ট পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরদিন স্বাধীন হয় ভারত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। তবে তার এই জনপ্রিয়তা ছিল মেরুকৃত এবং অঞ্চলভেদে মাত্রাও ছিল ভিন্ন। মুসলিম লীগের প্রধান নেতা হিসেবে তৎকালীন ভারতের মুসলমানদের একটি বড় অংশের কাছে তিনি একক ও অবিসংবাদিত মহান নেতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

অন্যদিকে কংগ্রেসের সমর্থক, অমুসলিম এবং শহুরে মুসলমানদের একটি অংশের কাছে তার জনপ্রিয়তা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। দেশভাগের প্রাক্কালে সংঘটিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ভারতের অখণ্ডতা ভেঙে যাওয়ার জন্য অনেকেই তাকেই দায়ী মনে করতেন।

নতুন রাষ্ট্রের পূর্ব অংশ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বললেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নিল। ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে করাচিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের অধিবেশনে অন্যতম সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কার্যপ্রণালি বিধির ওপর এক ঐতিহাসিক সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের ভাষা হিসেবে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জোরালো দাবি উত্থাপন করেন। তবে গণপরিষদের সভাপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের উপস্থিতিতেই তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই যুক্তিসঙ্গত দাবি প্রত্যাখ্যান করে। সংসদীয় রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাংলার দাবিতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপই ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি।

অবশ্য তারও আগে ১৯৪৭ সালের জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেওয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। ওই বছরের ডিসেম্বরেই তমদ্দুন মজলিস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্যোগে প্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। তারা বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলে।

পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় আসেন জিন্নাহ। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এটিই ঢাকায় তার একমাত্র সফর। ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক তার ‘ভাষা আন্দোলন’ বইয়ে (২০০৯) লিখেছেন, “এ সফর পূর্বনির্ধারিত হলেও আমাদের বিশ্বাস, এর উদ্দেশ্য ছিল এক ঢিলে দুই পাখি মারা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গের জনসাধারণকে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎদান এবং সেই সঙ্গে তার বিশাল জনপ্রিয়তার চাপে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নস্যাৎ করা। কারণ, তখনও এ দেশের মানুষ ‘কায়েদে আজম’ বলতে আবেগে অন্ধ।”

ঢাকায় এসে তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে বক্তৃতা দেন—রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসমাবেশে, কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এবং পাকিস্তান বেতারে।

প্রতিটি ভাষণেই তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল একই। পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। কমিউনিস্ট ও বিদেশি চরদের প্রচারণায় বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। ভাষার প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণ করা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল—এমন বক্তব্যও তিনি দেন। একই সঙ্গে তিনি জনগণকে দলে দলে মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে জাতির খেদমতে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান।

সরকারের সমালোচনাও তার চোখে ছিল রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এসব ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ ব্যক্তিকে কঠোর হাতে দমন করার ঘোষণাও তিনি দেন। আহমদ রফিক তার বইয়ে লিখেছেন, “পাকিস্তানের পরবর্তী শাসক ও রাষ্ট্রপ্রধানেরা জিন্নাহর তৈরি করে দেওয়া পথ ধরেই হেঁটেছেন। এবং রাষ্ট্র ও সরকারকে ভিন্ন অস্তিত্বে দেখতে শেখেননি। গোটা পাকিস্তানি শাসনামলে রাষ্ট্রনায়কেরা রাষ্ট্রদ্রোহ শব্দটার চমকপ্রদ সদ্ব্যবহার করেছেন। জেল, নির্যাতন, জুলুম, হত্যা—কিছুই বাদ যায়নি।”

জিন্নাহর জনপ্রিয়তা তখন এতটাই তুঙ্গে ছিল যে, রাজনৈতিক মহল থেকে এসব বক্তব্যের তেমন কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি। ব্যতিক্রম ছিলেন শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক। জিন্নাহর অগণতান্ত্রিক ও বাংলাবিরোধী বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে ২৩ মার্চ তিনি একটি বিবৃতি দেন। ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় তির্যক শিরোনামে সেটি প্রকাশিত হয়।

<div class="paragraphs"><p>১৯৪৮ সালের ২০ মার্চ ঢাকা সেনানিবাসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম. আহমাদকে পদকে ভূষিত করেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।</p></div>

১৯৪৮ সালের ২০ মার্চ ঢাকা সেনানিবাসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম. আহমাদকে পদকে ভূষিত করেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

তবে রেসকোর্সের ভাষণের পর ছাত্রদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ভাষাসৈনিক ও প্রথম শহীদ মিনারের নকশাকার ডা. সাঈদ হায়দার ‘একুশের সংকলন’ বইতে লিখেছেন, “প্রতিবাদ করার বদলে ছাত্রসমাজের একাংশ সভাস্থল ছেড়ে চলে যায়। যাওয়ার পথে সাজানো তোরণে কিছু ভাঙচুরও করে।”

১৯৮০ সালে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ওই ‘একুশের সংকলন’টিতে অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন, জিন্নাহ সাহেবের ভাষাবিষয়ক বক্তব্যের পর তাঁদের কিছু কর্মী ও ছাত্র ‘নো নো’ বলে চিৎকার করে ওঠে এবং সভায় হইচই শুরু হয়ে যায়।

তবে একই সংকলনে প্রকাশিত লেখায় তৎকালীন কমিউনিস্ট কর্মী সরদার ফজলুল করিম ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “জিন্নাহ সাহেবের বক্তৃতার দিন আমি রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলাম... জিন্নাহ সাহেব উর্দুতে ভাষণ দেন। বক্তৃতা করতে করতে এক জায়গায় তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কমিউনিস্ট আছে, তোমাদের মধ্যে গুপ্তচর আছে, তোমাদের তারা বিভ্রান্ত করছে। আমি বলছি, ভাষার ক্ষেত্রে যে প্রশ্ন উঠেছে তাতে উর্দু, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’”

তিনি আরও লিখেছেন, “জিন্নাহ সাহেবের ভাষণ শোনার পর ছাত্ররা এতই মর্মাহত হয়েছিল যে হলে ফেরার পথে (সংবর্ধনার জন্য তৈরি) তোরণ তারা ভেঙে ফেলে। অনেকে বলেছেন, জিন্নাহ সাহেব রেসকোর্সে ভাষণ দানকালে ভাষার প্রশ্নে যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তার প্রতিবাদ সেখানেই হয়েছিল। কিন্তু এ কথা ঠিক নয়। আমি একজন সচেতন কর্মী হিসেবেই সেখানে গিয়েছিলাম... সেখানে কোনো বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ আমি লক্ষ করিনি।”

তবে ২৪ মার্চ কার্জন হলে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহর বক্তৃতা এবং উপস্থিত ছাত্রদের একাংশের ‘নো নো নো’ স্লোগানে প্রতিবাদ সবাইকে চমকে দেয়। সেদিন তিনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করছিলেন। প্রতিবাদের মুখে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেও পরে যথারীতি বক্তৃতা শেষ করেন। এরপরের বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে এটি বলা যায় যে, জিন্নাহর ‘উর্দু, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’র ঘোষণা বাঙালির গতিপথ ঠিক করে দিয়েছে।

তবে চমকপ্রদ আরেকটি ঘটনা ঘটে সেদিন সন্ধ্যায়। যেটি বদরুদ্দীন উমর রচিত ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ (প্রথম খণ্ড), অলি আহাদের ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’সহ আরও অনেকের স্মৃতিকথায় এসেছে।

সেই সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে জিন্নাহর সাক্ষাতের কথা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রাবাসের ভিপি ও জিএসকে সেই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই সূত্রে জগন্নাথ হলের দুজন হিন্দু ছাত্র প্রতিনিধিও অন্য মুসলিম ছাত্রনেতাদের সঙ্গে প্রতিনিধি দলে অংশ নেন।

জিন্নাহ ছাত্রদের সঙ্গে ভাষা আন্দোলন ও সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু প্রতিনিধি দলে হিন্দু ছাত্রদের উপস্থিতি দেখে তিনি সতর্ক হয়ে যান। কারণ, মুসলিম লীগ ও জিন্নাহর তৎকালীন ধারণা ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনের পেছনে কলকাতার হিন্দু নেতা বা কমিউনিস্টদের উসকানি রয়েছে।

ফলে হিন্দু ছাত্রদের উপস্থিতিতে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ মুসলিম রাজনীতি বা রাষ্ট্রভাষার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনায় যেতে চাননি। সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত কিছু কথা বলে তিনি সাক্ষাৎকার পর্বটি দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু জিন্নাহর এই সাম্প্রদায়িক ধারণা পরবর্তী সময়ে ভুল প্রমাণিত হয়। তার ঠিক চার বছর পর, ভাষা আন্দোলনে শহীদদের তালিকায় পাওয়া যায় সব মুসলমানের নাম।

এ প্রসঙ্গে আহমদ রফিকের একটি উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, “আজকাল কেউ কেউ জিন্নাহ সাহেবকে গণতন্ত্রী প্রমাণ করতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে প্রদত্ত তার বক্তৃতার (১১ অগাস্ট ১৯৪৭) কথা উল্লেখ করে থাকেন, ‘এখন থেকে কেউ আর মুসলমান বা হিন্দু নন, সবাই পাকিস্তানি’ ইত্যাদি। কিন্তু ঢাকা সফরে এসে একাধিক বক্তৃতায় তিনি প্রমাণ করেন যে তিনি অহংবোধে আক্রান্ত একনায়ক এবং অগণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক এক রাষ্ট্রনায়ক।”

এরপর ঢাকা থেকে জিন্নাহ করাচি ফিরে যান। কিন্তু ভাষার প্রশ্ন সাময়িকভাবে স্তিমিত হলেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা রয়ে যায়। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান থেকে জিন্নাহ এক চুলও নড়েননি। তার ব্যক্তিগত প্রভাব, বিপুল ব্যক্তিত্ব ও অনড় অবস্থানের কারণে ছাত্রনেতাদের একাংশ কিছুটা পিছু হটে। ফলে ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রত্যক্ষ পর্বের অবসান ঘটে এবং আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।

জিন্নাহ যে তার অবস্থান থেকে সরেননি তার প্রমাণ এর অব্যবহিত পরেই দেখা যায়। ৬ এপ্রিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন আইনসভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পরিবর্তে কেবল ‘পূর্ববঙ্গের সরকারি ভাষা’ এবং শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব পেশ করেন। এর পাশাপাশি সরকার ও উর্দুপন্থিরা বাংলা ভাষাকে ‘ইসলামীকরণ’ করার নামে আরবি বা রোমান হরফে বাংলা লেখার মতো নানা প্রস্তাবও সামনে নিয়ে আসেন।

এর মধ্যে ঢাকা সফরের কয়েক মাস পরই, ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর খাজা নাজিমুদ্দীন পাকিস্তানের নতুন গভর্নর জেনারেল হন। এরপর ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষার প্রশ্নে টানাপোড়েন চলতে থাকে, তবে আনুষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।

কিন্তু ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে খাজা নাজিমুদ্দীন পুনরায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা ঘোষণা করলে আবার আন্দোলন দানা বাঁধে, যা চূড়ান্ত রূপ নেয় একুশে ফেব্রুয়ারি। সেদিন কী ঘটেছিল সেটি সবাই জানি, ফলে সেই আলোচনা এখানে অপ্রয়োজনীয়।

তবে সেদিন কতজন ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের লাশ গুম ও তথ্য গোপনের নীতির কারণে প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে গবেষক, পত্রিকা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচজন ভাষাশহীদকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে। তারা হলেন—আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম ও শফিউর রহমান।

বরেণ্য সাংবাদিক ও গবেষক এম. আর. আখতার মুকুলের তৈরি তালিকায় আটজন শহীদের নাম পাওয়া যায়। ওপরের পাঁচজন ছাড়াও সেখানে ছিলেন আবদুল আউয়াল, অহিউল্লাহ—যিনি ছিলেন ৯-১০ বছরের শিশু—এবং একজন অজ্ঞাতনামা কিশোর।

তৎকালীন ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক আজাদ’ এবং কলকাতার ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে নয়জন মারা যান। মার্কিন দূতাবাসের তৎকালীন তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪ জন। তবে ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের প্রথম স্মারকগ্রন্থ ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’র একেবারে শেষাংশে কবির উদ্দিন আহমেদ সংকলিত ‘একুশের ঘটনাপুঞ্জী’ প্রতিবেদনে ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি সর্বমোট ৩৯ জন শহীদ হওয়ার দাবি করা হয়।

এই ত্যাগের ফল ছিল মধুর। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলা ও উর্দুকে যৌথভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

তাহলে প্রশ্নটি যদি আবার মনে করিয়ে দেওয়া যায় যে, ১৯৪৮ সালে মৃত্যুবরণ করা জিন্নাহর সঙ্গে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সম্পর্ক কোথায়—তার উত্তর নিশ্চয়ই পাওয়া যায়?

জিন্নাহ ১৯৫২ সালের আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেননি। তিনি তখন জীবিতও ছিলেন না। ১৯৫২ সালের আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সাংগঠনিক বিস্তার এবং চূড়ান্ত পরিণতিও তার মৃত্যুর পর ঘটেছে। কিন্তু তাই বলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না—এমন দাবি ইতিহাসকে বিকৃত করার শামিল।

কারণ, ভাষার প্রশ্নে পাকিস্তান রাষ্ট্রের যে অবস্থান ১৯৪৭-৪৮ সালে তৈরি হয়েছিল, যার প্রবক্তা ছিলেন জিন্নাহ, ঢাকায় এসে তিনি প্রকাশ্য জনসভা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তার মৃত্যুর পরও সেই রাষ্ট্রীয় অবস্থান একচুলও নড়েনি। বরং তার উত্তরসূরি রাজনৈতিক নেতৃত্ব একই অবস্থান ধরে রাখে এবং ১৯৫২ সালে তা নতুন করে বিস্ফোরণের জন্ম দেয়। ফলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই ছিল না—এমন দাবি ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করা ছাড়া আর কিছু নয়।

এর সঙ্গে এটিও বলা যায়, ১৯৪৮ সালে যে অবিশ্বাসের বীজ জিন্নাহ ঢাকায় বপন করে গিয়েছিলেন, তার চূড়ান্ত পরিণতি শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছিল একাত্তরে—স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে।

রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক।বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশে পরিচালিত প্রকল্পে ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত। ই-মেইল: raju_norul@yahoo.com

  • জিন্নাহপ্রীতি
  • ভাষা আন্দোলন ১৯৫২
  • গণপরিষদ প্রস্তাব
  • কার্জন হল সমাবর্তন
এ সম্পর্কিত খবর
পাকিস্তানের স্কলারশিপ কেলেঙ্কারি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার দায় কার?
পাকিস্তানের স্কলারশিপ কেলেঙ্কারি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার দায় কার?
হাজারীবাগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
হাজারীবাগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
কোটা আন্দোলনের সময় রাশেদকে নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত চলছে: চিফ প্রসিকিউটর
কোটা আন্দোলনের সময় রাশেদকে নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত চলছে: চিফ প্রসিকিউটর
সুরিয়াভানশির সঙ্গে জায়গার লড়াই? যা বললেন স্যামসন
সুরিয়াভানশির সঙ্গে জায়গার লড়াই? যা বললেন স্যামসন

Follow us:

  • হ্যালো
  • লিঙ্গ সমতা
  • জলবায়ু পরিবর্তন
  • ইতিহাস
  • খবরাখবর
  • ছবির ভাষা
  • শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন
  • ক্যারিয়ার
  • অন্য চোখে
  • স্বাস্থ্য ও পুষ্টি
  • ভিডিও
  • শিক্ষাঙ্গন
  • আমার কথা
  • বাল্যবিয়ে
  • তারকা শিশু
  • বিশ্বজুড়ে
  • কথায় কথায়
  • শিশুশ্রম
  • সাময়িকী
  • সব খবর

Copyright © 2026, bdnews24