গ্রামের নাম কাঁকনডুবি: দুই শিশুর যোদ্ধা হয়ে ওঠার উপন্যাস

'কিন্তু স্বাধীন দেশে ডোরা কোথায় চলে যায় আর কিসে রঞ্জুর চোখে জল আসে? কিংবা এই গ্রামের নীলিমার তুলসী তলায় লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের কী হবে?'
গ্রামের নাম কাঁকনডুবি: দুই শিশুর যোদ্ধা হয়ে ওঠার উপন্যাস

“এইখানে আসলে তিনটি আলাদা আলাদা দেশ হওয়ার কথা ছিল। বাঙালিদের একটা দেশ, পাঞ্জাবিদের একটা দেশ আর ইন্ডিয়া।” কিন্তু হলো দুইটি। ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান। কিন্তু তারপর?

তারপর কী হলো সেই গল্প নিয়ে রচিত শিশুসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাস ‘গ্রামের নাম কাঁকনডুবি।’

রাক্ষুসে নদী কালীগাঙের তীরবর্তী গ্রামের নাম কাঁকনডুবি। হয়তো স্কুলে যেতে না পারা কোনো কিশোরী কিংবা কোনো গাঁয়ের বধুর হাতের কাঁকন ডুবে গিয়েছে এই কালীগাঙে। হয়তো তারপরে এই গ্রামের নাম হয় কাঁকনডুবি। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কেউ কিছু জানেন না।

রূপ-রঙ ও সৌন্দর্যে কাঁকনডুবি বাংলাদেশের অন্য দশটি গ্রামের মতোই। কিন্তু গ্রামের কিশোর রঞ্জু ও শহর থেকে আসা কাজীবাড়ির মেয়ে কিশোরী ডোরার দুঃসাহস ও স্পর্ধা কাঁকনডুবি গ্রামকে অনন্য করে তোলে।

রঞ্জু তার নানীর সঙ্গে থাকে। তার বেশি সময় কাটে কালীগাঙ নদীর তীরে। রঞ্জুর বাবা মা দুইজনই এই নদীতে ডুবে মারা যান। তাই কালীগাঙকে তার নানী ‘রাক্ষুসে নদী’ নামে ডাকেন। রঞ্জুকে নিয়েও নানীর ভয় কাটে না। কারণ রাক্ষুসে কালীগাঙের সঙ্গে তার বেশি সময় কাটে।

এই গ্রামেরই কাজীবাড়ির বড় ছেলের ছোট মেয়ে ডোরা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে আসে তার পরিবার। তখন ডোরার সঙ্গেই ভালো বন্ধুত্ব হয় রঞ্জুর। রঞ্জুর সঙ্গে ডোরাও মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। ডোরা যেন পুনর্জন্ম নেওয়া আরেক প্রীতিলতা।

“মাগরেবে পাকিস্তান আর মাশরেকে পাকিস্তান” এ দুইয়ে মিলে একটি দেশ। কিন্তু মেজর ইয়াকুবের চোখে শকুনের দৃষ্টি “ম্যায় ইস মুলককা জমিন চাতা হুঁ। লোক নেহি।” কিন্তু মায়ের বুক থেকে সন্তানকে কি আলাদা করা যায়? না করা যায় না। এরই  মধ্যে বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী ঘোষণা, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” আর এই মন্ত্রই হয়তো স্কুল পড়ুয়া রঞ্জু আর ডোরাকে বয়সের চেয়েও বড় করে দিয়েছে। দেশকে বাঁচাতে দুই শিশু স্টেনগান হাতে তুলে নেয়।

এই উপন্যাসে লেখক আরো কিছু চরিত্র বিবৃত করেছেন, সেগুলো পাঠকের মনে সহজে দাগ কাটতে পারে, যেমন মাসুদ স্যার, পাইকার ভাই।

স্কুল শিক্ষক মাসুদ স্যারকে স্যার না ডেকে ভাইও ডাকা যায় সহজে। মাসুদ স্যারের আগমন রঞ্জুদের একঘেয়ে স্কুল জীবনে নতুন আমেজ নিয়ে আসে। মাসুদ ভাইয়ের ভক্ত বনে যায় ওরা সবাই। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশের ডাকে সাড়া দিতে কাউকে কিছু না বলে তিনি উধাও হয়ে যান।

শত্রুর বুলেট পাইকার ভাইয়ের জীবনও কেড়ে নেয়। তবে চোখের স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি। মৃত্যুকে হাতে নিয়ে তিনি বলেন, “আছি। আমি আছি। আমি যাব না— আমি সব সময় থাকব।”

লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই বইটি লিখতে গিয়ে যেন আরো একবার কিশোর হয়ে ওঠেন। আমি যতবার তার লেখা পড়ি ততবার মনে হয় তিনি যেন চিরন্তন এক কিশোর।

রঞ্জু ও ডোরা যুদ্ধে যায়। নয় মাসের লড়াইয়ে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু স্বাধীন দেশে ডোরা কোথায় চলে যায় আর কিসে রঞ্জুর চোখে জল আসে? কিংবা  এই গ্রামের নীলিমার তুলসী তলায় লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের কী হবে?

এইসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েই সমাপ্তি ঘটে ‘গ্রামের নাম কাঁকনডুবি’ উপন্যাসের।

‘গ্রামের নাম কাঁকনডুবি’ উপন্যাসটি দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও সময়ের সাথে বদলে যাওয়া ভালো-মন্দ মানুষের গল্পকে তুলে ধরেছে। উপন্যাসটি আমাদের প্রত্যেকের পড়া উচিত।

প্রতিবেদকের বয়স: ১৪। জেলা: ঢাকা।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.

সর্বাধিক পঠিত

No stories found.