“গত মাসে আমার চার হাজার টাকার পাঞ্জাবি বিক্রি হয়েছে, এক হাজার টাকার গহনা বিক্রি হয়েছে।"
Published : 01 Sep 2022, 07:54 PM
পড়াশোনার পাশাপাশি ঝুঁকিহীন নানা কাজে যুক্ত হয়ে উপার্জন করছে অনেক শিক্ষার্থী। নিজের দক্ষতা বাড়ানোকেই এর পেছনের মূল কারণ হিসেবে দেখছে তারা।
হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে এমন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর কথা হয়েছে। যারা নিজ উদ্যোগেই কর্মক্ষেত্র তৈরি করে কাজ করছে। সঙ্গে সামলে নিচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাও।
১৪ বছর বয়সী সারাহ আলমাস একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের এ লেভেলে পড়াশোনা করছে। ভাষা শেখানোর গৃহশিক্ষক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সে লেখালেখি করে। এছাড়াও বাবার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেও সে কাজ করে।

সারাহ বলছিল, “আমি এতদিন দুজনকে ইংরেজি শেখাতাম। এখন একজন ব্যাংকার আমার স্টুডেন্ট। তিনি আমাকে ভালো একটা সম্মানি দেন। এছাড়াও আমার বাবা একজন নির্মাতা, তার একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে সহাকারি পরিচালক হিসেবেও আমি কাজ করি।”
উপার্জনের টাকা খরচের পরও কিছু টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব হয় জানিয়ে সে বলে, “একেক মাসে আমার একেক রকম আয় হয়। তবে এভারেজ যা হয় তা থেকে কিছুটা জমিয়ে রাখি আর বাকিটা আমার পড়াশোনার জন্য কাজে লাগাই। আমার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর্নিং হলো এক লাখ টাকা। যেটা আমি নিজেই একটা ডকুমেন্টারি বানিয়ে পেয়েছিলাম।“
কথা হয় সুমিত কুণ্ডু নামে নওগাঁ সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। একটি স্কুলে শিশুদের অঙ্কন শেখানোর পাশাপাশি অনলাইন একটি শপও চালায় সে।
সুমিত হ্যালোকে বলছিল, “আমি মূলত হ্যান্ড পেইন্ট নিয়ে কাজ করি। পাঞ্জাবি, শাড়ি, ব্লাউজ, কাতুয়া, কূর্তি, মাস্ক এগুলোতে বিভিন্ন ডিজাইন করে আমার ফেইসবুক পেইজ থেকে সেল করি। ম্যাটেরিয়ালগুলো আমাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে কিনে আনতে হয় এবং হ্যান্ড পেইন্টের রঙ সম্পর্কে একটু রিসার্চ করতে হয়, ডিজাইন সিলেক্ট করতে হয়। প্রথমদিকে আমার সময় বেশি লেগেছে, এখন আমি ৩-৪ ঘণ্টায় ৩/৪ টা পাঞ্জাবিতে কাজ করতে পারি।”

উপার্জন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সে বলে, “গত মাসে আমার চার হাজার টাকার পাঞ্জাবি বিক্রি হয়েছে, এক হাজার টাকার গহনা বিক্রি হয়েছে। যে টাকা আমি আমার পড়াশোনা ও হাত খরচে কন্ট্রিবিউট করতে পারি।”
এই কাজের ধারণা কীভাবে মাথায় এসেছে জানতে চাইলে সুমিত বলে, “২০২১ সালে পূজোর সময় আমি একটা পাঞ্জাবি নিজের জন্য করে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন সবাই ব্যস্ত ছিল, কেউ আমার অর্ডারটি নেয়নি। তখন আমি নিজেই নিজের পাঞ্জাবিটা পেইন্ট করি এবং আমি সেটা ফেইসবুকে শেয়ার করি। এরপর আমার এক বন্ধু আগ্রহী হয় পাঞ্জাবির ডিজাইন করাতে। তার কাছ থেকেই আমার প্রথম আয় হয় ৪০০ টাকা।"
সিরাজগঞ্জের বড় কোয়ালিবেড় উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন উপার্জনের জন্য বেছে নিয়েছে ফ্রিল্যান্সিংকে।
সে বলে, “আমি ফাইভার মার্কেটপ্লেসে গ্রাফিক্স ডিজাইন ও সিপিএ মার্কেটিং করি। প্রতিদিন আমার ২-৩ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। আমার অনেক কিছু শেখা হচ্ছে এতে। আয়ের কিছু অংশ আমার পড়াশোনার জন্য ব্যয় করি এবং বাকিটা পরিবারকে দেই।”

ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও পড়াশোনার ক্ষতি হয় কিনা জানতে চাইলে নাজমুল বলে, “পড়াশোনার ক্ষতি হয় না কিন্তু একটু চাপ থাকে। প্রথম প্রথম পরিবার থেকে বাধা দিত কিন্তু এখন আর দেয় না। ফ্রিল্যান্সিংয়ে যদি সফল হতে পারি তবে অন্যদের শেখানোর জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করার ইচ্ছা রয়েছে।”
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন গোলাম রাব্বী নীরব। তিন ভাইয়ের মধ্যে মেজ তিনি। ঢাকার রামপুরায় পরিবারের সঙ্গেই থাকছেন। হঠাৎই তার মনে হয়েছে দেশে তরুণদের জন্য চাকরির বাজার বেশ সংকুচিত। এই ভয় তাকে আর দেরি করতে দেয়নি। সাত-পাঁচ না ভেবে খুব দ্রুত সিদ্ধান্তে যুক্ত হয়ে যান সাইকেল ব্যবসায়।

নীরব হ্যালোকে বলছিলেন, “আমি এক ভাইয়ের সঙ্গে অংশীদারিত্বে বিজনেসটা করছি। আমরা কাস্টমস ডিল করে বিদেশ থেকে নানা ব্র্যান্ডের সাইকেল নিয়ে আসি। এছাড়াও সাইকেলের পার্টস নিয়ে আসি, কারণ কেউ অর্ডার করলে আমরা গ্রাহকদের কাস্টমাইজ সাইকেলও বানিয়ে দেই।”
ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপাতত পড়াশোনার সঙ্গে এটি চালিয়ে যাচ্ছি। নিজের স্কিলটাও বাড়ছে। আমরা আগের দোকানটা বাদ দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই বড় একটা দোকানে উঠব। সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়ারও পরিকল্পনা আছে। আসলে জব সিকিউরিটি নিয়ে তরুণদের মধ্যে যে ভয় আছে সেটা আমার মধ্যেও আছে। তার জন্যই এই প্রয়াসটা। ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু করার চেষ্টা তো অবশ্যই থাকবে।”
প্রতিবেদকের বয়স: ১৪। জেলা: রংপুর।