অন্য চোখে

সাহিদুল ইসলাম সাহিদ (১৫), সাভার

Published: 2019-03-30 16:06:22.0 BdST Updated: 2019-04-01 16:03:15.0 BdST

ক্লাসে স্যারের মুখে শুনেছি তার দুর্বিষহ শরণার্থী জীবনের কথা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যখন বাংলাদেশের এক কোটির বেশি মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে গিয়েছিল সে এক কোটি মানুষের মাঝে তিনি ছিলেন একজন। তখন তিনি ছিলেন শিশু।

ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের মাঝে শিশুর সংখ্যা ছিল বিরাট। যুদ্ধ চলার সময়টা তার কেটেছে এক দুঃস্বপ্নের মতো।

তার শরণার্থী জীবনের অধ্যায় আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। প্রাণের ভয়ে বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে গিয়েছেন ভারতে। নানা সমস্যা পার হয়ে গিয়েছেন সেখানে। যাওয়ার পথে একটা ভয় কাজ করত তা, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে ধরা পড়ার ভয়।

শুনেছি কয়েকদিন প্রায় না খাওয়া ছিলেন। সাধারণ জীবনের চেয়ে কঠিনতর ছিল শরণার্থী শিবিরে কাটানো সময়। শারীরিক, মানসিকভা­­বে ছিলেন বিপদগ্রস্ত। তার শিশু মনে শুধু ঘুরতো, দেশে থাকার সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচারের দৄশ্য। মানুষ হত্যা, ধ্বংস, অবিচার, লুণ্ঠন তীব্র আঘাত হানে তার শিশু মনে।

ঠিক এমনি শরণার্থী শিশুদের জীবন। দূর থেকে বসে আমরা যা অনুভব করতে পারব না। ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের হিসেব মতে নির্যাতন, সংঘর্ষ, সহিংসতা বা মানবাধিকার লংঘনের ফলে ৬৮.৫ মিলিয়ন মানুষ জোরপূর্বক বিশ্বব্যাপী বিতাড়িত হয়েছে। তার মাঝে অর্ধেকের বেশি শিশু।

জাতিগত বৈষম্য, ধর্মীয় উগ্রতা, রাজনৈতিক প্রভাবে ও অন্যান্য কারণে নিজের জীবনের নিরাপত্তাহীনতার অভাবে একজন মানুষ শরণার্থী হতে বাধ্য হয়। সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আসে সিরিয়া, দক্ষিন সুদান ও আফগানিস্তান থেকে। বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করছে। তাদের এই মানবেতর জীবনে সবচেয়ে বেশি শিকার শিশুরা। যে বয়সটায় তাদের খেলে, পড়ে কাটানোর সময় তখন তারা নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি দিয়ে কষ্টকর জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

নিজের দেশ থেকে পাড়ি দিতে গিয়ে সাগরে , নদীতে ডুবে মারা যাচ্ছে অনেকে। এদের মাঝে শিশুর সংখ্যা অনেক। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে নাফ নদীতে নৌকাডুবিতে মারা গিয়েছে।

১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ পাশ করা হয়। যেখানে ৫৪টি ধারায় অনেকগুলো শিশু অধিকার স্বীকৃত হয়। এগুলো হলো স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সাং­­স্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নির্যাতন থেকে শিশুকে রক্ষা, নাগরিক অধিকার ইত্যাদি।

জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৯১টি দেশ এ চুক্তিতে সাক্ষর করেছে। কিন্তু বর্তমান অবস্থা কী? শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়? যুদ্ধ বিবাদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শিশুরাই। শরণার্থী হয়ে কাটছে তাদের জীবন। যে সময়টা আমরা আনন্দে কাটাচ্ছি সে সময় ওরা ভাবছে আজ খেতে পারবে কিনা!

দু’মুঠো খাবারের জন্য দাঁড়াতে হচ্ছে লম্বা লাইনে। থাকার জন্য নেই স্বাস্থ্যকর বাসস্থান। এসব শিবিরে কিছু সুযোগ সুবিধা পেলেও নিশ্চিত হচ্ছে কি শিশুদের মৌলিক অধিকার? পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব এসব শিশুদের। শিবিরে আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগে। এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে তারা।

যত না শারীরিকভাবে বিপর্যয়গ্রস্ত তার চেয়ে বেশি বিপর্যয়গ্রস্ত মানসিকভাবে।এই শিশুরা চোখের সামনে দেখেছে সংঘাত, মানুষের নৄশংস মৃত্যু, নির্যাতন। কতোটা অপ্রীতিকর আর যন্ত্রণাদায়ক তা বোঝা দায়।

১২ বছরের রোহিঙ্গা শিশু দিলারা বেগম ইউনিসেফকে বলেছে, “আমার স্বপ্ন ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়া।” আচ্ছা বলুন তো দিলারার স্বপ্ন কী পূরণ হবে নাকি শরণার্থী শিবিরেই একেবারে মিশে যাবে এরকম অসংখ্য শিশুর জীবন? আমরা চাই দিলারার মতো সব শিশুর স্বপ্ন পূরণ হোক। নিরাপদে থাকুক প্রত্যেকটা শিশুর জীবন। আদর, ভালোবাসা, আন­­ন্দে কাটুক ওদের দিন।

প্রত্যেকটা শিশুর জীবন নিরাপদ করতে হলে সোচ্চার হতে হবে পুরো পৃথিবীকে। ধ্বংস, যুদ্ধ­ , হানাহানিকে না বলতে হবে। যুদ্ধ নয় সমঝোতায় আসতে হবে। মুছে দিতে হবে ধর্মীর উগ্রতা, জাতিগত বিদ্বেষ।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত