‘যুদ্ধ থেকে এসে দেখি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানিরা’

‘বিজয়ের আনন্দ তো ছিল অনেক। তবে যুদ্ধ থেকে এসে দেখি আমাদের বাড়ি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জ্বালিয়ে দিয়েছে। এরপর ভাঙা পোড়া টিন দিয়ে কোনো রকমে থাকার ব্যবস্থা করি।’
‘যুদ্ধ থেকে এসে দেখি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানিরা’

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আলকাছ আলীর সঙ্গে কথোপকথনে হ্যালোর শিশু সাংবাদিক তাজুল ইসলাম ছামি।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কাউকে না জানিয়ে ভারতে যান মো. আলকাছ আলী। ট্রেনিং শেষে ৪ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীনের পর গ্রামে ফিরে দেখেন নিজের আশ্রয়ের ঘরটুকুও আর নেই। হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের সঙ্গে আলাপচারিতায় মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন এই বীর যোদ্ধা।

হ্যালো: আপনি যখন মুক্তিযুদ্ধে যান তখন আপনার বয়স কত ছিল?   

মো. আলকাছ আলী: আমি যখন মুক্তিযুদ্ধে যাই, তখন আমার বয়স ছিল ১৮ বছর। আমি তখন রাজা জি সি হাই স্কুলের ছাত্র ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম। তখন মুক্তিযুদ্ধের কারণে আমি পরীক্ষা দিতে পারিনি।

হ্যালো: আপনি কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন?

মো. আলকাছ আলী: আমি ৪ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করি। ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিই। বাড়িতে মা বাবাকে বলে যাওয়ার উপায় ছিল না। জানলে তারা যুদ্ধে যেতে দিতেন না।

আব্বা ক্ষেতে কৃষি কাজ করতে ছিলেন। আমি উনার জন্য খাবার নিয়ে যাই। আব্বাকে খাবার দিয়ে কাউকে না জানিয়ে আমি ট্রেনিং নিতে চলে যাই।

হ্যালো: ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়ার কোনো স্মৃতি কি মনে আছে?

মো. আলকাছ আলী: বর্ডার পার হয়ে করিমগঞ্জে যাই আমরা। সেখানে আগে থেকে কিছু মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমরা তাদের সঙ্গে যোগ দেই। সেখান থেকে কিছুদিন পর আমাদের পাঠানো হলো এক বনে। সেখানে আমরা জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে তাবু বসাই। এক মাস দশ দিন আমরা সেখানে ট্রেনিং করি।

হ্যালো: ট্রেনিং শেষে দেশে ফেরে যুদ্ধে যোগ দেন?

মো. আলকাছ আলী: হ্যাঁ। ট্রেনিং শেষে আমরা কুলাউড়ার কৈলাশহর চলে আসি। এটি মৌলভীবাজারের কাছের একটি জায়গা। আমরা এখানে থাকতে শুরু করি। সেখান থেকে যুদ্ধে যাওয়া শুরু হলো।

আমরা প্রথমে  কৈলাশহর-আলীনগর গ্রামে যুদ্ধ করি। সেখানে একটা মনু গাঙ আছে। তার পাশে নমুজা নামে একটি জায়গা ছিল, সেটা আমরা দখল করি। সেখানে একটা ব্রিজ ছিল, নাম মনু ব্রিজ। সেখানেও আমরা যুদ্ধ করি। 

হ্যালো: রাজাকাররা আপনাদের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল?

মো. আলকাছ আলী: রাজাকার যারা ছিল, তারা আমাদেরকে ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করত। অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে তারা ধরিয়ে দেয়। রাজাকারদের নৌকা ছিল। তারা নৌকায় করে নদী পার হতো। আমাদের নৌকা ছিল না। আমরা নদীর দুই পাশে দড়ি বেঁধে নদী পার হতাম। এভাবে নদী পার হয়ে আমরা গেরিলা যুদ্ধেও অংশ নিয়েছি।

হ্যালো: যুদ্ধের সময় আপনার কাছে কী কী জিনিস ছিল?

মো. আলকাছ আলী: কিছুই না। শুধু একটা লুঙ্গি আর একটা গেঞ্জি ছিল। আর যুদ্ধের জন্য ছিল অস্ত্র। সে সময় আমরা মুড়ি আর পানি খেয়ে যুদ্ধ করেছি।

হ্যালো: আপনার সঙ্গে আরও কতজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল?

মো: আলকাছ আলী: আমি ও আমার বড় ভাইসহ ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম।

হ্যালো: দেশ স্বাধীনের পর যখন বাড়িতে এলেন, তখন মনে কেমন আনন্দ ছিল? 

মো. আলকাছ আলী: বিজয়ের আনন্দ তো ছিল অনেক। তবে যুদ্ধ থেকে এসে দেখি আমাদের বাড়ি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জ্বালিয়ে দিয়েছে। এরপর ভাঙা পোড়া টিন দিয়ে কোনো রকমে থাকার ব্যবস্থা করি।

হ্যালো: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মো. আলকাছ আলী: তোমাকেও ধন্যবাদ।

প্রতিবেদকের বয়স: ১৬। জেলা: সিলেট।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.

সর্বাধিক পঠিত

No stories found.
bdnews24
bangla.bdnews24.com