‘মোস্তফা আর বসে থাকা যাচ্ছে না, যুদ্ধে যেতে হবে’

“এরপর পঞ্চগড়ের চাওয়াই নদীর পাশে একদিন সকাল ৭টায় ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিই। এতে কয়েকজন পাক সেনা নিহত হয়। পরে পাকিস্তানি সেনাদের দোসর রাজাকারদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করি।”
‘মোস্তফা আর বসে থাকা যাচ্ছে না, যুদ্ধে যেতে হবে’

মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যুদ্ধের জন্য ঘর ছাড়েন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিকনমাটি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা। ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে যোগ দেন ৬ নম্বর সেক্টরে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিস্ফোরক তৈরি দল ডেমোলেশন গ্রুপের বিশেষজ্ঞ ছিলেন তিনি। তার তৈরি বিস্ফোরক দিয়েই অনেক সেতু ধ্বংস করে মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধের সেই সব স্মৃতির কথা হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

হ্যালো: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে গেলেন?

গোলাম মোস্তফা: ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ শুনে তখনই মুক্তিযুদ্ধে যাব বলে ঠিক করেছি। এরপর ২৫শে মার্চ কালরাতে যখন নিরীহ বাঙালির উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে,তখন আমার মনে প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে ওঠে। তাই, নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই।

হ্যালো: যুদ্ধে যাওয়ার দিন বাড়ির পরিবেশ কেমন ছিল?

গোলাম মোস্তফা: এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহের এক রাতে, রাত তখন ১২টা। এলাকার কয়েকজন ছেলে এসে আমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে। প্রথমে ভেবেছি চোর এসেছে। তারপর বের হয়ে দেখি ওরা এই এলাকারই ছেলে। ওরা আমাকে বলল, “মোস্তফা আর বসে থাকা যাচ্ছে না, যুদ্ধে যেতে হবে।”

তারপর যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিই। আমার সঙ্গে আমার ছোট ভাই রবিউল আলম রব্বিও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। বিদায় বেলায় মা অনেক কেঁদেছিলেন। মা মাথা ছুঁয়ে দোয়া করে অস্ফুট সুরে বলল, জয়ী হয়ে ফিরে এসো বাবা।

হ্যালো: বাড়ি থেকে বের হয়ে কোথায় গেলেন?

গোলাম মোস্তফা: বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে আমার পরিচিত খালেক দা, ববিন দা, ওসমান দা ও মুক্তাসহ আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। আমরা একসঙ্গে ভারতে রওনা দেই। নদীর পাড় ঘেঁষে পাট ক্ষেত, ধান ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে প্রায় ১৪ মাইল হেঁটে পৌঁছাই সাবেক মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়ার বাড়িতে। সেখানে কিছু খেয়ে সকালে তিস্তা পাড়ি দিয়ে ভারতের মিকলীগঞ্জের সীমান্তে পৌঁছাই।

সেসময় আমরা নীলফামারী ট্রেজারি থেকে ১২টি থ্রি নট রাইফেল নিয়েছিলাম।

সেখান থেকে আমরা কুচবিহারের দেওয়ানগঞ্জ ইয়ুথগঞ্জ ইয়ুথ ক্যাম্পে যাই। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করি। এই ক্যাম্পটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ডোমার-ডিমলার কয়েকজন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা।

হ্যালো: আপনারা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন কোথায়?

গোলাম মোস্তফা: প্রশিক্ষণের জন্য ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে আমরা চলে যাই দেওয়ানগঞ্জের (ভারতের) জিগাতলী ক্যাম্পে। সেখানে কিছুদিন প্রশিক্ষণ নিই। তারপর এক বিকেলে আমাদের ৪০-৫০ জনকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় মূর্তি ক্যাম্পে যা মুজিব ক্যাম্প নামেই পরিচিত ছিল।

এখানে গ্রুপ ভাগ করা হলো, আমাদের মাঝে দায়িত্ব বন্টন করা হয়। আমাদের কোম্পানি কমান্ডার হলেন ঠাকুরগাঁওয়ের আব্দুল হামিদ, প্লাটুন কমান্ডার হলেন সহিদার রহমান মানিক আর আমি হলাম গ্রুপ কমান্ডার। এখানে আমরা অস্ত্র চালনা শেখার পর গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল, ডেমোলিশন, উঁচু দেয়াল টপকানো, দড়িতে ঝুলে পার হওয়া ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিই।

প্রশিক্ষণ চলাকালে একদিন আমি জলপাইগুঁড়ির চালাসা নামক স্থানে আর্টিলারি ট্রেনিং সেন্টারে যাই। সেখানে বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামালের সঙ্গে আমার দেখা হয়।

হ্যালো: প্রশিক্ষণ শেষে কত নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন?

গোলাম মোস্তফা: ট্রেনিং শেষে ৬ নম্বর সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা খাদেমুল বাশারের নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠি। যুদ্ধে আমি ছিলাম ডেমোলেশন গ্রুপের স্পেশালিস্ট। আমার দলের সদস্য ছিল ১২ জন।

হ্যালো: মুক্তিযুদ্ধের এমন কোনো স্মৃতি মনে আছে, যা এখনো আপনাকে তাড়া করে?

গোলাম মোস্তফা: মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি আছে। তবে এমন দুইটা স্মৃতি আছে, যা আমার মনে যখন তখন হানা দেয়। প্রথমটি হলো, আমাদের একজন সহযোদ্ধা ছিলেন, যার নাম আইয়ুব মাস্টার। তিনি খুব সাহসী গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন। তার বাড়ি পঞ্চগড় হওয়ায়, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও এলাকা রেকি করার জন্য তাকে পাঠানো হলো। তিনি লুঙ্গি আর একটি শার্ট পরে রেকি করতে যান। তার সঙ্গে ছিল একটি দা ও দুইটি গ্রেনেড। তিনি সব তথ্য সংগ্রহ করে ফেরার পথে রাজাকাররা তাকে চিনতে পারে। তিনি এক এক করে দুইটি গ্রেনেড ছুঁড়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজাকাররা তাকে ধরে ফেলে। দুই পা উপরে বেঁধে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে ব্লেড দিয়ে নির্মম অত্যাচার করে তাকে হত্যা করে রাজাকাররা।

আরেকটি ঘটনা হলো, একদিন পঞ্চগড় বিএডিসি বিল্ডিংয়ে পাকিস্তানি পতাকা উড়াতে দেখে আমাদের মাথায় যেন আগুন ধরে যায়। পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা তুলে দেওয়ার সময় আমার টিম কমান্ডার হারুন অর রশিদসহ আরও দুইজন পাক বাহিনীর ব্রাশ ফায়ারে শহীদ হন। সঙ্গে সঙ্গে আমরাও ব্রাশ ফায়ার করি এবং পাক সেনারা এতে নিহত হয়। তারপর আমরা সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেই।

হ্যালো: অপারেশনের কোনো স্মৃতি মনে আছে?

গোলাম মোস্তফা: আমাদের ডেমোলেশন গ্রুপের কাজ ছিল, পাক বাহিনীর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা। আমার দায়িত্ব ছিল ডেমোলেশন তৈরি। যেখানে যে প্রযুক্তি দরকার, সেখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে তা তৈরি করে অপারেশনে অংশগ্রহণ করাই ছিল আমার মূল দায়িত্ব।

প্রথম মিশনে পাক সেনাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে মিরগড় বিওপি ক্যাম্প উড়িয়ে দেই আমরা। এখানে সফলতা অর্জন করায় চলতে থাকে একের পর এক মিশন।

এরপর পঞ্চগড়ের চাওয়াই নদীর পাশে একদিন সকাল ৭টায় ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিই। এতে কয়েকজন পাক সেনা নিহত হয়। পরে পাকিস্তানি সেনাদের দোসর রাজাকারদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করি।

সেই যুদ্ধের পর পাক সেনাদের অনেক গোলাবারুদসহ যুদ্ধ সংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করি আমরা। এরপর আমরা পঞ্চগড়ের চাকলায় সম্মুখ যুদ্ধ করে পাক সেনাদের পিছু হটাতে বাধ্য করি।

আরও একটি মিশনের কথা বলি। পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়া যাতায়াতের একমাত্র ব্রিজ দাড়িয়াপাড়া। আমরা টেলিফোনের খুঁটিতে বিস্ফোরক সংযুক্ত করে টর্পেডো চার্জ দিয়ে এই ব্রিজটি উড়িয়ে দেই।

এরপর আমরা পাক সেনাদের চলাচলের রাস্তায় একটি বিস্ফোরক পুঁতে রাখি। যেটি জিপ আসা মাত্র দূরে রাখা সংযোগ ব্যাটারির মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটায়। এভাবে একদিন আমরা পাক বাহিনীর একটি জিপে বিস্ফোরণ ঘটাই। এতে সাতজন খানসেনা নিহত হয়। এটা আমাদের একটি দুঃসাহসিক অভিযান ছিল।

সে অভিযানের পর পাকসেনাদের সঙ্গে আমাদের তুমুল গোলাগুলি হয়। সে যুদ্ধে সহিদার রহমান মানিক, সৈয়েদার রহমান মুক্তা, শিমুল বাড়ীর ফারুক, রংপুরের মোতাহার ছিলেন আমার সহযোদ্ধা। সেদিন আমাদের আক্রমণে পাকসেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

এছাড়াও নানান অপারেশনের মধ্যে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের মাঝখানে বিদ্যুতিক পোল চার্জ দিয়ে টাঙ্গন ব্রিজ উড়িয়ে দেই।

হ্যালো: পাক বাহিনী ও রাজাকাররা আপনার পরিবারের কোনো ক্ষতি করেছে?

গোলাম মোস্তফা: আমরা দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ায়, আমার বাবা মরহুম আবুল কাশেমকে পাক বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। বাবাকে টর্চার সেলে নির্মম নির্যাতন করে। তাদের অত্যাচারে তিনি বহুদিন অসুস্থ ছিলেন। পরে তিনি মারা যান। নীলফামারীর ডোমার উপজেলা পরিষদের হলুদ বিল্ডিংই ছিল এই টর্চার সেল।

হ্যালো: তরুণ প্রজন্মের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

গোলাম মোস্তফা: তরুণ সমাজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক, এটাই আমার প্রত্যাশা।

প্রতিবেদকের বয়স: ১৩। জেলা: নীলফামারী।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.

সর্বাধিক পঠিত

No stories found.