‘এ আসল মুক্তিযোদ্ধা, একে গুলি করে মারা হোক’

'পরিবারকে না জানিয়ে ট্রেনিং নিতে ভারতে চলে যাই।'
হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের শিশু সাংবাদিক সুদীপ্ত দেবনাথের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক সরদার।

হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের শিশু সাংবাদিক সুদীপ্ত দেবনাথের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক সরদার।

মুক্তিযোদ্ধা মো. ফজলুল হক সরদার নয় নম্বর সেক্টরে যুদ্ধে করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাড়ি থেকে পালিয়ে ভারতে ট্রেনিং নিতে যান তিনি। যুদ্ধকালে আটক হয়ে নির্যাতনের শিকার হোন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। সেখান থেকে পালিয়ে এসে আবার যুদ্ধে যোগ দেন। বিজয় ছিনিয়ে পরেই ঘরে ফেরেন। হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথোপকথনে জানান সে সব অভিজ্ঞতার কথা।

হ্যালো: আপনি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা?

ফজলুল সরদার: হ্যাঁ, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা।

হ্যালো: আপনি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার তাগিদ পেয়েছিলেন কোথায় থেকে? মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়াটা  তখন কেন অনিবার্য মনে হয়েছিল আপনার?

ফজলুল সরদার: আমাদের সিনিয়র ছিল হাবিল, হাসেম ও মজিদ। এরা সবাই বলে যে, তারা রাত আটটার সংবাদে শুনতে পেয়েছে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের জন্য দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তখনই ভেবেছি যুদ্ধে যোগ দিতে হবে। পরিবারকে না জানিয়ে ট্রেনিং নিতে ভারতে চলে যাই।

হ্যালো: ভারতে কীভাবে গেলেন? কেমন ছিল সে যাত্রা?

ফজলুল সরদার: আমার সঙ্গে ছিল হাবিল ও রবিন। আমরা একসঙ্গে যাত্রা করি শ্যামনগর থেকে। পায়ে হেঁটে নদী পার হয়ে হিঙ্গলগঞ্জ গিয়ে উঠি। সেখান থেকে যাই টাকি ট্রেনিং সেন্টারে। এখানে আমরা দুপুরের খাবার খাই ও সেদিন এখানে অবস্থান করি।

এরপর আমরা চলে যাই উড়িষ্যার বিহারে। সেখানে আমরা ট্রেনিংয়ে অংশ নিই। এক মাস পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় বাগুন্দিয়া ক্যাম্পে। সেখান থেকে হাসনাবাদ হয়ে হিঙ্গলগঞ্জ আসি।

সেখানে দেখা হয় আমাদের এমপি ফজলুল হক সরদারের সঙ্গে। মেজর জলিল, ক্যাপ্টেন বেগ ও ক্যাপ্টেন বাশার আমাদের হাতে অস্ত্র গুলি তুলে দিয়ে শ্যামনগরে পাঠিয়ে দেন।

হ্যালো: দেশে ফেরার পর যুদ্ধের প্রথম দিনগুলো কেমন ছিল?

ফজলুল সরদার: আমরা ছিলাম মোট ১২ জন। আমাদের ক্যাপ্টেন ছিলেন মিজানুর রহমান। চিংড়ি খালিতে আমরা ক্যাম্প করি। সেখান থেকে শ্যামনগর পর্যন্ত পায়ে হেঁটে রেকি করে আসি।

পাকিস্তানিদের কাছে অস্ত্রশস্ত্র কী পরিমাণ আছে, তারা কী করছে, কোন পথে যাচ্ছে এইসব দেখেশুনে সিদ্ধান্ত নিতাম। কারণ আমাদের কাছে অস্ত্র ছিল কম। গুলিগোলা কম খরচ করতে হবে-এটাই ছিল পরিকল্পনা।

প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে তিন দিনের দিন আমরা শ্যামনগর থানা আক্রমণ করি। থানা অ্যাটাক করার পরে রাজাকাররা পালিয়ে যায় আর পুলিশ স্যারেন্ডার করে। ওদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমরা ক্যাম্পে চলে আসি।

হ্যালো: যুদ্ধকালে আপনি কি কখনো পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন?

ফজলুল সরদার: হ্যাঁ। আমরা শ্যামনগর থানার ওয়াবদায় ক্যাম্প সরিয়ে আনার পর হঠাৎ একদিন পাকিস্তানিরা ক্যাম্পে আক্রমণ করে। আমরা ছিলাম দশ থেকে বারো জন। পাশে পাঁচিল থাকার কারণে আমরা তাদের দেখতে পাইনি। তারা গুলি বর্ষণ করতে থাকে। ক্যাম্পের যোদ্ধারা খাল সাঁতরে পার হয়ে গেল। কিন্তু আমি পাকিস্তানির বাহিনীর হাতে আটক হয়ে যাই।

আমাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে থানায় নিয়ে যায়। থানায় শ্যামনগরের তৎকালীন চেয়ারম্যান শামসুল বলল, স্যার এ হচ্ছে আসল মুক্তিযোদ্ধা। সে আমাদের থানা লুট করেছে এবং আমাদের দোকানপাট লুট করেছে। একে গুলি করে মারা হোক।

পাকিস্তানি মেজর বলল, খামোশ। একে মারা হবে না। যশোর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গিয়ে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে বিচার করা হবে। আমাকে অনেক নির্যাতন করা হলো।

যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে আমি এক বাড়িতে আশ্রয় নিই। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর আমি আবার ভারতে চলে যাই। সেখানে চিকিৎসা নিই।

সুস্থ হয়ে বরিশালে ফিরি এবং আবার যুদ্ধে যোগ দেই।

হ্যালো: স্থানীয় রাজাকাররা ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল?

ফজলুল সরদার: হ্যাঁ। একবার এক চাচা আমাদের তার বাড়িতে দুপুরে খেতে বলে। খাওয়া-দাওয়া শুরু হলে তিনি বললেন, বাসায় ডাল ফুরিয়ে গেছে আমি ডাল নিয়ে আসতেছি। তোমরা বস।

এই চাচা যে রাজাকার ছিল তা আমাদের জানা ছিল না। কিছু শিশু আমাদের সংকেত দেয় যে, চাচা পাকিস্তানিদের খবর দিতে গেছে। সেই সংকেত পেয়ে আমরা সেখান থেকে পালিয়ে যাই।

হ্যালো: যুদ্ধের শেষের দিনগুলো সম্পর্কে কিছু বলেন?

ফজলুল সরদার: মেজর কাওসারের নেতৃত্বে আমরা বরিশাল শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করে পুলিশ লাইনে অ্যাটাক করি।

এরপর পুলিশ লাইন দখল করে আমরা ওখানে অবস্থান করতে শুরু করি। এভাবে কিছু দিন থাকার পর মেজর কাওসার সাহেব আমাদের বার্তা দিলেন যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, তোমরা নিজেদের জেলায় চলে যাও।

এরপর আমরা ৩০ থেকে ৩২ জন মুক্তিযোদ্ধা খুলনা থেকে সাতক্ষীরা চলে আসি। আমি পায়ে হেঁটে বাড়ি আসি। আমি তো বিশ্বাসই করতে পারিনি যে, পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পরার পরেও জীবিত ফিরে আসতে পারব।

হ্যালো: এদেশের নিরীহ মানুষের উপর পাকিস্তানিদের অত্যাচারের মাত্রা ছিল অবর্ণনীয়...

ফজলুল সরদার: পাকিস্তানিরা প্রচুর নির্যাতন করছে। মেয়েদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছে। আমাকে ধরে নিয়ে যখন শ্যামনগরের বকুলতায় রাখল, আমি তখন চার-পাঁচ জন নারীকে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছি।

রাস্তা ঘাটে, খালে বিলে প্রচুর মানুষের মৃত দেহ দেখেছি। যা গুনে শেষ করা যাবে না।

হ্যালো: নতুন প্রজন্মের প্রতি আপনার কোনো আহ্বান?

ফজলুল সরদার: আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেলাম বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। তোমরা নতুন প্রজন্ম এটাকে ধরে রাখবা, এটাই আমার আশা আকাঙ্ক্ষা। তোমাদের কাছে আমরা একটাই দাবি, মুক্তিযুদ্ধটাকে ব্যর্থ হতে দিবা না। তোমরাই গুছিয়ে রাখবা দেশটাকে।

হ্যালো: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

প্রতিবেদকের বয়স: ১৪। জেলা: সাতক্ষীরা।

এ সম্পর্কিত খবর

No stories found.

সর্বাধিক পঠিত

No stories found.