আমার কথা

নূশরাত ইসলাম তৃষা (১৪), বাগেরহাট

Published: 2020-03-11 17:42:55.0 BdST Updated: 2020-03-11 17:48:45.0 BdST

আমার নাম তৃষা, আমার ছোট বোনের নাম তৃপ্তি। আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি আর সে তৃতীয় শ্রেণিতে।

আমরা দুজনই বাগেরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আমাদের বিদ্যালয়টা বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে। প্রতিদিন বাবার সাথে স্কুলে যাই আর আম্মু ছুটির পর নিয়ে আসে। শুধু আমাদের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে বাবা-মায়ের প্রতিদিনই এভাবে কষ্ট করতে হয়।

মেয়েকে নিয়ে মা-বাবা যতটা চিন্তিত হন সেই একই চিন্তাটা ছেলে সন্তানকে নিয়ে করেন না। কারণ আমাদের সমাজ ছেলেকে দেখে একভাবে আর মেয়েকে দেখে আরেকভাবে। সমাজের এই বৈষম্য চলে আসছে যুগযুগ ধরে। যে পায়ে নূপুর পরে আমরা খেলে বেড়াতে চাই, সেই পায়ে এক অদৃশ্য শক্তি আমাদের শেকল পরিয়ে দেয়।

আমাদের পরিবারও ছেলে ও মেয়েকে আলাদাভাবে বড় করেন। আমার জন্য খেলনা বলতে শুধু হাঁড়ি-পাতিল আর পুতুল। আর আমার কাপড় বা জুতার রঙ মানে গোলাপী। নরম-কোমল আমার বিশেষণ। আর ছেলে সন্তান মানেই তাকে শেখানো হয় ছেলেরা কাঁদে না, ছেলেদের শক্ত হতে হয়। তার খেলনা কখনো পুতুল হতে পারবে না, সে খেলবে গাড়ি দিয়ে বা ব্যাট-বল দিয়ে। ছেলেরা গোলাপী রঙের জিনিস পড়তে পারবে না ইত্যাদি।

তাছাড়া মেয়ের ঋতুস্রাব হলে এটা প্রকাশ করা যাবে না। কানে-কানে, ফিস-ফিস করে রাখতে হবে বিষয়টা। আর ছেলের জন্য মুসলমানীর অনুষ্ঠান ঘটা করে পালন করা হবে। আমাদের ঘরের শিক্ষাগুলো হলো এরকম। আমাদের ঘরগুলো এমন বলেই সমাজ আজ এরকম হয়েছে।

মেয়েদেরকে সবসময় মনে করা হয় এরা মেধায় দুর্বল। এদেরকে সহজ কাজ বা সহজ বই পড়তে দেওয়া উচিত। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলগুলোতে প্রতিবারই এগিয়ে থাকছে মেয়েরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দেখি ছেলেদের চেয়ে বেশি স্বর্ণপদক পায় মেয়েরা। আমার প্রশ্ন, তাহলে মেয়েদের কেন দুর্বল মনে করা হয়?

মেয়ে দূরের স্কুলে কী করে যাবে, যাতায়াতে সমস্যা হবে না তো ইত্যাদি প্রশ্ন শুধু আমাদের ক্ষেত্রেই উঠে। ছেলেদের কোনোকিছুতেই এত প্রশ্ন উঠে না। মেয়েরা জোরে হাসতে পারবে না, ছেলেরা জোরে কাঁদতে পারবে না। আমরা কে, কীভাবে আচরণ করব তা ঠিক করে দেওয়ার কাজ যেন সমাজের।

আরও যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় আমাদের – মেয়েরা সাংবাদিক কেন হবে? এটা তো ছেলেদের পেশা। মাঠে-ময়দানে মেয়েরা কি দৌড়াতে পারবে ইত্যাদি আরও কত কী।

একটা মেয়ে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হলে দোষটা তাকেই দেওয়া হয়। প্রশ্ন তোলা হয় তার পোশাক এমন ছিল, ওমন ছিল, তার চাল-চলন ভালো ছিল না ইত্যাদি। আজ মেয়ে বলে সমাজ আমাদের নানাভাবে আটকে রাখতে চায়, থামিয়ে দিতে চায়। আমার ঘৃণা তাদের প্রতি।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত