আমার কথা

মো. মাহফুজুল হক তুষার (১৬), জামালপুর

Published: 2019-10-27 19:31:14.0 BdST Updated: 2019-10-27 19:31:14.0 BdST

প্রাথমিক স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে গেল সেই অতি পরিচিত সুবিশাল দিঘী৷ অনেকদিন হয়ে গেল এ পথ দিয়ে হাঁটি না।

অথচ এক সোনালী সময়ে এ পথের স্নেহ মাখা ধুলো আর মমতা জড়ানো ঘাস প্রতিদিন পরম স্নেহ নিয়ে আমায় বরণ করেছে। এরপরেই চোখ পড়ল পুকুর পাড়ের সরু পথের পাশেই টিনে ঢাকা আধা পাকা ঘরগুলোর দিকে৷ যেখানে বহুদূর থেকে আসা আমার বন্ধু, ছোট ভাই, বড় ভাইয়েরা থেকেছেন৷ জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার মহান প্রয়াসে এই ছাত্রবাসকেই বানিয়ে নিয়েছিলেন নিজের বাড়ির মতন৷

পুকুরঘাটের দিকে চোখ পড়তেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে এলো৷ কত আড্ডা, কত আনন্দ উচ্ছ্বাসের স্মৃতি এই ঘাটকে ঘিরে৷ সেগুলো যেন আবার নাড়া দিয়ে উঠে৷ নিস্তব্ধ, মলিন ঢেউ পেরিয়ে চোখ চলে গেলো মাঠের দিকে। টিফিনের সময় কত খেলাই না হয়েছে এখানে। ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, কাবাড়ি আরও কত কী৷ 

ছাত্রাবাসের সীমানা পেরিয়ে ক্যাম্পাস গেইট দিয়ে ঢুকতেই হাতের বাম পাশেই ক্যান্টিন। মনে পড়ে যায় কত কথা,  "আজ বৃষ্টি হচ্ছে, চল স্কুলে যাই, ডাবল টিফিন পাবো৷" আহা, স্মৃতি।    

দু পা এগুলেই প্রশাসনিক ভবন৷ প্রধান শিক্ষকের কক্ষের দিকে তাকালেই মনে পড়ে পরম শ্রদ্ধেয় শঙ্কর কুমার ঘোষ স্যারের কথা৷ জ্ঞানার্জন, চরিত্র গঠন, শিষ্টাচার, নিয়মানুবর্তিতা সবই শিখিয়েছিলেন পরম মমতায়৷ টিচার্স রুমের কত স্মৃতি উঁকি দিয়ে ডাকে৷ তৃতীয় ঘণ্টার পর ছুটির জন্য কতই না মিনতি শ্রেণিশিক্ষকের কাছে৷ 

পড়ন্ত বিকেলের সোনালী রোদ, বাতাসের কোমল ছোঁয়ায় চোখ দুটি ছলছলিয়ে উঠে৷ ভাবতুর মন তাকে নিয়ে যায় অতীতে, ছোট্ট এক বালক -বয়সের চেয়েও ছোট অবয়ব তার। শার্ট-প্যান্ট দুটোই সাদা, যেন একগুচ্ছ কাশফুল৷ প্রায় চার মাইল পথ পেরিয়ে প্রতিদিন এসেছে গর্বিত,  উজ্জ্বল এ বাগানে।

নান্দিনা এম এইচ কে সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে আমারই সেই উজ্জ্বল বাগান। শীতের এক মিষ্টি সকালে,  ভয় আর আশা জড়ানো এক স্বপ্ন নিয়ে ২০১৪ সালে।

নিজ গ্রামেই পড়ার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও উন্নত শিক্ষা অর্জন ও সঠিক মনন গঠনের জন্য ভর্তি হয়েছিলাম এই বিদ্যাপীঠে। দুই অগ্রজ জুলফিকার ও মোর্শেদুল,  সহপাঠী সৌরভ ও সুপ্ত এদের সাথেই পাড়ি দিতাম এই দূরত্বের পথ। 

চোখে চশমা,  ক্লিন সেভ,  লম্বাটে আর হ্যান্ডসাম ফিগারের শঙ্কর স্যার  স্কুলটিকে আপন মনে সাজিয়েছিলেন৷ দৈহিক ও মানসিক উভয়ের সমন্বয়ে এক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ তিনি৷

প্রথম দিকে গুটি কয়েক ছাত্র ছাড়া সবাই আমার কাছে নতুন৷ আস্তে আস্তে সবাই হয়ে উঠলো অতি পরিচিত৷ তাছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় সপ্তম স্থান দখল করে প্রথম সারিতে থাকায় আলাদা নজরও ছিল সবার৷ ধীরে ধীরে পাঁচটি বছরে সুসম্পর্ক গড়ে উঠে মাহবুব, নূর ইসলাম, অপূর্ব, তাজ, তাসিক, দারুণ নাঈম, শুভ, মাহির, আবির, আপন, সজিব, এনামুল, রিসাত, দিসান, শামীম, মেহেদী, মিরাজ, আরিফুল, সুমন, মেহরা সহ সকলের সাথেই৷ কোথায় হারিয়ে গেলো সেই দিনগুলি?

লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ায় ক্রমেই বন্ধুমহলে সাংবাদিক উপাধি পেতে দেরি হলো না৷ কেউ বলতো বিনয়ের সুরে কেউবা উপহাসের সুরে৷ তবে ভালোবাসা সবগুলোতেই সমান ছিল যেন৷

এসব ভাবতে ভাবতে মনটা অবসন্ন হয়ে উঠে। হৃদয়টা ভারী হয়ে উঠে৷ অবিরত সময়ের স্রোতে সবাই অভিমান করে হারিয়ে গেছে যে যার মতো। স্মৃতিতে রয়ে গেছে সোনালী রূপালি মধুর সেই দিনগুলি৷

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত