আমার কথা

শিলা আক্তার মৌ (১৭), ঢাকা

Published: 2019-08-10 16:24:13.0 BdST Updated: 2019-08-10 16:24:13.0 BdST

আমরা যে কতটা কুসংস্কার এ আচ্ছন্ন তা হয়তো আমরা নিজেরাও উপলব্ধি করতে পারি না। আমরা ‘মীনা’ কার্টুনে ছেলে মেয়ের যে বৈষম্যটা দেখি তা আসলে বাস্তবেরই একটি অংশ। কিছু পরিবারের দৃশ্য দেখলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছেই করবে না যে আমরা ২০১৯ আছি।

আশেপাশে অনেকের কাছেই শুনি ছেলের আশায় একাধিক বিয়ের ঘটনা, মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ায় স্ত্রীকে মারধর কিংবা তালাক।   কতটা নির্মম ভাবা যায়? পুত্রসন্তানের আশায় স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

আমার নিজের একটি ছোট ঘটনা বলি, আমরা তিন বোন, আমি সবার ছোট। মায়ের কাছে প্রায়ই গল্পের ছলে শুনেছি আমি যখন জন্মাই সকলের আশা ছিল এবার একটা ছেলে হবে বা হোক। কিন্তু আমার বাবার এমন কোনো আবদার ছিল না। তবে আমার দাদী আমার জন্মের পর মাকে বলতেন, ‘একটা ছেলে সন্তান দত্তক নাও, তোমার তো আর ছেলে হবে না।’

সে এ নিয়ে কখনও খুশি ছিলেন না। এমন কী আমার মায়ের তিনটি মেয়ে বলে আত্মীয় স্বজনের অনেক কটুকথা শুনতে হয়েছে।

আমার পরিবারের এ ঘটনাটি বলার একটি কারণ হলো আমি ভাবতাম এ সব কুসংস্কার বোধহয় আমার বাবা মায়ের যুগে প্রচলিত ছিল। কিন্তু কদিন আগে এক প্রতিবেশী ঘটনা খুব নাড়া দিল। তারও চারটি মেয়ে রয়েছে। উনি আবার সন্তানসম্ভবা। শুনলাম এবার মেয়ে হলে তার স্বামী তাকে ডিভোর্স দেবেন।

আমরা ঠিক কতটুকু নির্বোধ হয়ে আছি এখনও বুঝতে পারছেন?

আমাদের সমাজে অনেকে মনে করেন পুত্র সন্তান বংশের প্রদীপ, ভবিষ্যৎ বংশধর এবং সম্পত্তির রক্ষক। ছেলে বড় হলে চাকরি, ব্যবসা করবে আর মেয়ে বড় হলে বিয়ে দিয়ে শ্বশুড়বাড়ি পাঠাতে হবে এই চিন্তা চেতনা থেকে কী আজও আমরা বের হতে পেরেছি? আজকের দিনে নারীরা বিশ্বে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে সমান ভূমিকা পালন করে চলেছে। পিছিয়ে নেই কোন ক্ষেত্রেই। মেয়েরা লিখছে, পড়ছে এবং প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে।

মেয়ে জন্মের পর বিয়েই কি তাদের জীবনের লক্ষ্য? কিন্তু মেয়েরাও যে একদিন বড় হয়ে ছেলেদের পাশাপাশি পরিবারের হাল ধরবে এ কথা বিশ্বাসই করতে চায় না অনেকে। মেয়েরা ছেলে সন্তান থেকে আলাদা নয়, বোঝা নয় বরং তারাও এ দেশের নাগরিক, এ রাষ্ট্রের অংশ।

সেকালের ভাবনায় ডুবে আছে কিছু তথাকথিত পুরুষ সমাজের পুরুষরা। তারা এখনও বিশ্বাস করে ছেলে মানেই বংশের প্রদীপ, তাহলে মেয়েরা বংশের কী? না মেয়েরা বংশের অংশই নয়, তাই কি? প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ ভুল ধারণাটি আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছে যে পরিবারে পুত্রসন্তানই বংশের আলো। একটি ভুল ধারণা থেকে হাজারো ভুল ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। 

অনেক পরিবারে শিক্ষার ক্ষেত্রেও করা হয় অনেক বৈষম্য, ছেলে হলে পড়াশোনার সুযোগ পায় আর মেয়ে বলে বিয়ে দিয়ে দিতে হবে বলে পড়াশোনা করানো হয় না, হলেও খুব বেশি নয়। আপনার আশেপাশে এমন অহরহ ঘটনা পেয়ে যাবেন। ভাবা যায় কতটা বৈষম্যের শিকার মেয়ে শিশুরা!

যে সব ছেলেরা এখনও মনে করে যে ছেলে সন্তান বংশের প্রদীপ বা তার ভবিষ্যৎ তাহলে বুঝে নেন আপনি ঠিক কতটা অজ্ঞ! আর যে সকল পুরুষ ছেলে সন্তান আশা করেন আমি তাদের বলব বিয়ে করে প্লিজ একটি মেয়ের জীবন নষ্ট করবেন না। কারণ আপনার কারণে সে মেয়েটি হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পরে একটু একটু করে।

আর যে সব পুরুষ মনে করেন ছেলে সন্তান ছাড়া পরিবার অপূর্ণ তাহলে আমি তাদের বলবো আপনি পূর্ণ অপূর্ণের পার্থক্যই বোঝেন না। সেকেলের ভাবনাওয়ালা পুরুষদের বলি শুধু স্যুট বুট পরে আধুনিক হওয়া যায় না, আধুনিক চিন্তা আর আধুনিক ও ইতিবাচক পরিবর্তনও প্রয়োজন। যদি সত্যিকার অর্থে আধুনিক না হতে পারেন তাহলে তথাকথিক লোক দেখানো আধুনিকতার কোনো মানে হয় না।

একটা কথা বলে শেষ করতে চাই, আমার মায়ের তিনটি মেয়ে হওয়ার কারণে যারা মাকে কটুকথা শোনাতেন এখন ঠিক তারাই আমাদের নিয়ে অহংকার করেন এবং আমাদের পরিবারের উদাহরণ দেন সকলকে। আমরা একটি সুখী পরিবার এবং আমি একটি সুখী পরিবারের মেয়ে

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত