আমার কথা

লাবিবা চৌধুরী (১৭), ঢাকা

Published: 2019-04-11 21:46:29.0 BdST Updated: 2019-04-11 21:47:21.0 BdST

শিশুদের মুখস্থর বেড়াজাল থেকে  বাঁচাতে ২০০৯ সালে সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করে বাংলাদেশ সরকার।

প্রয়োগ ভিত্তিক নতুন এই শিক্ষা পদ্ধতি তৈরির উদ্দেশ্য-শিক্ষার্থীরা যেন নিজের বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে বই-এর মূলভাবকে আয়ত্ত করে। এই ব্যবস্থায় গাইড বই-এর কোনও জায়গা থাকবে না। শিক্ষার্থীকে আর কোচিং-এ যাওয়াও লাগবে না। বরং তারা একটি সুন্দর শৈশব পাবে।

শিক্ষার এই লক্ষ্য অত্যন্ত মহৎ, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা কি আসলেও সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে?

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি-আমি মনে করি না সৃজনশীল পদ্ধতি পুরাতন গাইড বই বা কোচিং সেন্টারকে সরিয়ে সুন্দর শৈশব আমাদের দিতে পেরেছে। বরং পুরাতন গতানুগতিক পদ্ধতিটির নতুন নাম সৃজনশীল পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০০৯ সালে আমি প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলাম। তাই যখন এই পদ্ধতির সূচনা হয়, তখন আমার সেটা নিয়ে তেমন মাথাব্যথা ছিল না। সরকারের এই সিদ্ধান্ত আমাকে তেমন প্রভাবিত করতে পারেনি।

কিন্তু পাঁচ বছর পর আমি নিজেই ষষ্ঠ শ্রেণিতে সৃজনশীল পদ্ধতির সম্মুখীন হই। প্রথমে ধারণা ছিল যে সৃজনশীল মানে নিজ ইচ্ছা মতো উত্তরপত্রে উত্তর লিখব। বই পড়ার কোনও দরকার নেই। গাইড তো দূরের কথা। মনে মনে শিক্ষামন্ত্রী ও সরকারকে ধন্যবাদ দিতে লাগলাম।

কিন্তু আমার ভুল ভাঙতে সময় লাগল না। আগে বইয়ের অনুশীলনীর কয়েকটা প্রশ্ন থাকত, যেগুলো পড়ে গেলেই কাজ হতো। যদিও পদ্ধতিটি সঠিক ছিল না-তবে সহজ ছিল। এখন শুধু অনুশীলনীর উত্তর পড়লেই চলে না, গাইডেরও চর্চা করাও লাগে। যেই জিনিসটা এই শিক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিল সেটাই আরও বেশি করে জেঁকে বসেছে।

উপায় না দেখে টিচাররাও তাই আমাদেরকে গাইড বইয়ে যেভাবে সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আছে ঐটাই আয়ত্ত করতে বলল। আবার গাইড কিনে সৃজনশীল মুখস্থ করা শুরু হল যেখানে সৃজনশীলতার কিছুই বাকি রইল না। শুরুতে যে আশা ছিল-গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাব, সেই আশা অতি জলদি ভেঙে গেল।

সৃজনশীল লেখার পদ্ধতি আয়ত্ত করতে অনেক সময় লাগল। টিচাররা ও কোচিং-এ একদম হাতে কলমে শেখানো শুরু করল। পাশাপাশি সৃজনশীল প্রশ্নের আবার সাজেশনও তৈরি হতে থাকল।

আবার এমন অনেক শিক্ষার্থী ছিল, যারা ঠিক মত আয়ত্ত করতে পারে নি এই পদ্ধতিটা। তাই পরীক্ষাতেও ভাল ফল করতে পারে নি। একে তো পরিবার থেকে চাপ তৈরি হল তাদের জন্য, অন্য দিকে শিক্ষকরাও তাদেরকে দুর্বল ভেবে হাল ছেড়ে দিল। এভাবে মানসিক চাপের সাথে অনেক অল্প বয়সেই তাদের মানিয়ে নিতে হল।

ক্লাস এইটে শুরু হল নতুন ঝামেলা-জেএস.সি পরীক্ষা। আবার অভিভাবকরা শুরু করে কোচিং-এ পাঠানো, গাইড কেনা, তার সাথে রয়েছে টেস্ট-পেপার ও সাজেশন। এ প্লাস যেন কোনও ভাবেই না ছোটে! ফলে সময় বাঁচাতে অনেক শিক্ষার্থেই স্কুলে না গিয়ে শুধু কোচিং করত।

প্রত্যেক টিচারের কাছে মডেল টেস্ট দেওয়া যেন সাধারণ ব্যাপার। অভিভাবকেরাও তুমুল উৎসাহে কোচিং-এর খাতায় নাম লেখায় আর হাজার হাজার টাকা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য খরচ করে।

এদিকে সন্তানের অবস্থা হতো বেগতিক। আমরা যারা এই যাঁতাকলে পড়ে এ প্লাস পেয়েছিলাম তারা ভাগ্যবানই বটে। কিন্তু যারা এ প্লাস পেল না তাদের পারিবারিক এবং মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল তা আর উল্লেখ করার প্রয়োজন হয় না।

একটা ঝামেলা মেটাতে নামেটাতেই শুনি নতুন ঝামেলা। এবার ৬টার জায়গায় ৭টা সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লিখতে হবে। আমি নিজেকে মধ্যমানের ছাত্রী মনে করি। আমার জন্য ৭টা সৃজনশীল লেখা অসম্ভব হয়ে গেল। তখন ‘quantity over quality’ এই স্লোগানে ৭টা কোন মতে শেষ করা গেল। কারণ বিশ্লেষণ করে লেখার মত সময় এবং শক্তি কোনও পরীক্ষায়ই পেলাম না।

অনেকে এই অল্প সময়ে ৭টা শেষ করতে না পারার দোষে পিছিয়ে পড়ে। তাদের ভাগ্যে জুটল আরও কোচিং আরও টিচার। অঙ্কেই কাঁদতে কাঁদতে হল থেকে বের হত। কোন ভাবেই যেন ৭টা শেষ হয় না।

জেএসসি পরীক্ষার মতো এসএসসি পরীক্ষার জন্যও কোচিং, মডেল টেস্ট, স্পেশাল ক্লাস ইত্যাদি চলতে লাগল। যন্ত্রণাদায়ক যাঁতাকলে আটকে পড়লেও বের হওয়ার উপায় নাই-অভ্যস্ত হতেই হবে-এত দিনে আমরা হয়েও গেছিও।

এখন যখন শুনি ফল খারাপ হওয়ার কারণে কেউ আত্মহত্যা করেছে তখন আর অবাক হই না। এই ব্যবস্থায় সবাই স্কুলের পর কোচিং, কোচিং-এর পর মডেল টেস্ট, মডেল টেস্টের পর প্রাইভেট পড়ে। ফল স্বরূপ হতাশায় আক্রান্ত হয়ে অসামাজিক হয়ে যায় এবং সেটাই হয়ে যায় স্বাভাবিক চিত্র।

যদিও সৃজনশীল নামের শিক্ষা ব্যবস্থা সরকার আমাদেরকে এমন পরিস্থিতি থেকেই মুক্তি দিতে তৈরি করেছিল, তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে আমরা সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি। মুখস্থ করা, কোচিং করা, প্রাইভেট পড়া, গাইড অনুকরণ করা এরই আরেক নাম এখন সৃজনশীলতা।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত
  • অভাবের কাছে হার মেনেছে শৈশব (ভিডিওসহ)

    জাহিদ। বয়স ছয় বছরের এদিক-ওদিক। বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার বয়সে তাকে বইতে হয় ইটের বোঝা।

  • শিশু সাংবাদিক হয়ে গেছি!

    আমার মামা একজন সাংবাদিক। তাকে দেখেছি সংবাদ নিয়ে কাজ করতে। একটা ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে কত দৌড়ঝাঁপ করতে। তাকে দেখেই আমার সাংবাদিক হওয়ার আগ্রহ জন্মায়।

  • প্রজাপতি, পাখনা মেলো (ভিডিওসহ)

    প্রজাপতি দেখতে খুব সুন্দর। এর জন্মানোর প্রক্রিয়াটাও তেমনি অদ্ভুত। ওদের জন্ম ডিম থেকেই হয়, কিন্তু ডিম থেকে সরাসরি প্রজাপতি বের হয় না। প্রথমে শুঁয়োপোকা বের হয়, তারপর সেই শুঁয়োপোকা এক সময় রূপান্তরিত হয় প্রজাপতিতে।