আমার কথা

পৃথা প্রণোদনা (১৫), ঢাকা

Published: 2018-07-26 15:57:05.0 BdST Updated: 2018-07-26 16:26:41.0 BdST

ছোট থেকেই শুনে আসছি, শিক্ষকদেরকে অনুসরণ করে শিশুরা শিখবে, শিক্ষকদের উৎসাহেই একজন শিশু জীবনে এগিয়ে যেতে পারবে। কারণ শিশুরা অভিভাবকের চেয়ে শিক্ষকের কথা মান্য করে বেশি। কিন্তু শিক্ষক যদি বলেন, ‘অংক পারো না, সায়েন্স পড়ে কী হবে?’ এটাই কি শিক্ষার্থীকে প্রেরণা দেওয়ার ভাষা?

যেসব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের এমনটা বলে থাকেন, শুধু তাদেরকে বলি, স্যার, আপনাদের কাছ থেকে এ কথাগুলো শুনলেআমরা খুবই হতাশাগ্রস্ত হই। মনোবল ভেঙে যায়। প্রত্যেক শিশুই আপনাদের কাছে যায় কিছু শিখতে, কিছু জানতে। আর এই শিখতে আর জানতে চাওয়াই তাদের স্বপ্ন পূরণের পাথেয়।

প্রত্যেক শিশুই ছোট থেকে স্বপ্ন দেখে বড় মানুষ হওয়ার, আর এই স্বপ্নটাকে বাড়িয়ে তুলতে তারা ছুটে যায় আপনাদের কাছে। আর আপনারা যখন নেতিবাচক কথা বলেন, আমাদের শেখার আগ্রহ, জানার ইচ্ছা হারিয়ে যায়, আমাদের স্বপ্নগুলি শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়ে যায়। 

অনেক শিক্ষক আলাপের সময় প্রথমেই পরীক্ষার রেজাল্ট জিজ্ঞাসা করেন। এবং এই পরীক্ষার রেজাল্টের মাধ্যমেই যেন তারা একজন শিশুর যোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা করেন। তাই প্রত্যেক শিশুর মাথায় একটা বিষয় গেঁথে যাচ্ছে যে, যেভাবেই হোক সবচেয়ে ভালো ফল করতেই হবে। নাহলে সে মানুষ হওয়ার যোগ্য নয়। কী অবাক কাণ্ড, তাই না? আর তাই আমরা ছুটতে থাকি কাগুজে ফলের পেছনে। তাই বর্তমানে আমাদের সমাজে কারো স্কুল কলেজের সনদে কতগুলি তারকা চিহ্ন মানে যোগচিহ্ন আছে সেটাই বিবেচ্য। নৈতিকতা, মানবতাসহ অন্য গুণের কথা ভাবাই হয় না প্রায়। আর তার ফলে নৈতিক অবক্ষয় অনিবার্য।      

বর্তমানে বেশিরভাগ শিশু শেখার চিন্তা করে না, তারা চিন্তা করে পরীক্ষার দিনক্ষণ, সিলেবাস শেষ হবে কি না ইত্যাদি। প্রাইভেট আর কোচিং নিয়েও তার ভাবনার শেষ নাই। তাই পরিবার বা সমাজের প্রতিও যে তার কিছু দায়িত্ব আছে সে কথা মাথায় থাকে না। মা বাবাও সেগুলো নিয়ে খুব যে মাথা ঘামান তা নয়। তারাও পরীক্ষায় ভালো ফলই চান। কিন্তু সন্তানের অন্যকোনো আচরণে যখন মনোক্ষুণ্ণ হন তখন নিজেরাও যে খানিক দায়ী, সে কথা ভুলে যান। শিক্ষিত হওয়া আর মানুষ হওয়ায় কোনো বিরোধ না থাকলেও আমরা শিক্ষিত অমানুষ হয়ে বেড়ে উঠছি এর উদাহরণ সমাজে ভুরিভুরি।  

আমরা প্রায়ই একটা কথা শুনি, ‘মানসম্মত শিক্ষা’। আমার মনে হয় পরীক্ষার ভয় দেখিয়ে শিশুদেরকে সবসময় চাপের মধ্যে রাখাটাই মানসম্মত শিক্ষিত হওয়ার পদ্ধতি। এ যেন জুজুর ভয় দেখিয়ে শিশুকে ঘুম পাড়ানো। অথচ আমরা কেউ কখনো প্রশ্ন করি না, শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা কেমন, শিক্ষকের আচরণ কেমন কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ কেমন।   

একজন শিশু ও তার শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত বলেই শুনেছি। তবে শিশুরা শিক্ষকদের দেখলেই ভয় পাবে কেন? দূর থেকে পালিয়ে বা এড়িয়ে যাবে কেন? তাই ক্লাসে শিক্ষক পড়া বুঝেছি কি না জিজ্ঞেস করলে, না বুঝে থাকলেও বলি, বুঝেছি। না বুঝতে পারাটা যে অন্যায় বা দুর্বলতা, এটাই আমাদের ধমকধামক দিয়ে শেখানো হয়েছে। আর তখন ‘বুঝেছি’টাকে সত্যি শিখে উঠতে দরকার হয়, কোচিং বা প্রাইভেট মাস্টার। 

পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করাটা অত্যন্ত জরুরি সন্দেহ নাই, তবে একজন মানুষকে শুধুমাত্র তার পরীক্ষার ফল দিয়ে বিচার করাটাও সঠিক নয়। হতে পারে সে যে বিষয়টি পছন্দ করে তাকে সেটি করতেই দেওয়া হয়নি। বা তাকে বুঝতেই দেওয়া হয়নি, কোন বিষয়ে তার মেধা বিকশিত হবে। অংক বা যে কোনো একটি বিষয়ে দুর্বল হলে বা না পারলেই একটি শিশু মেধাহীন হয়ে যায় না, সেটুকু অন্তত বুঝতে পারি! 

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত