আমার কথা

ইনজামাম-উল-হক নির্ণয় (১৫)

Published: 2013-08-03 13:16:58.0 BdST Updated: 2013-08-03 13:16:58.0 BdST

বাংলাদেশের আবহাওয়া, পরিবেশ আর মনোজগতকে দারুণ নাড়া দেয় বর্ষাকাল।

অঝোর ধারায় বৃষ্টি গাছগাছালিকে আরো সবুজ আরো সুন্দর করে তোলে। তাই বর্ষা নিয়ে মেতেছে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে শুরু করে অনেক কবি-সাহিত্যিকরা।

বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস দ্বিপদ নাম দিয়ে বিজ্ঞানে নামের নৈরাজ্য ঘুচিয়েছেন। তবে দৈনন্দিন জীবনে ফুল বা গাছের এমন দ্বিপদ নাম ব্যবহার করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে চলতি নাম, স্থানীয় নাম আর সেজন্য ঘটে "নামবিভ্রাট"। বর্ষার ফুল মালতী, মধুমঞ্জরীলতা আর মাধবী ফুলের কথা ধরা যাক।

ফুলের বাংলা নাম মালতী লতা। ‘ওই মালতীলতা দোলে, পিয়াল তরুর কোলে’ মালতী লতানো, কাষ্ঠল গাছ। ভারতীয় প্রজাতি। পাতা আয়তাকার, ৮.৪ সে.মি., বোঁটা ও শিরা লালচে। বর্ষায় কাক্ষিক মঞ্জরীতে কয়েকটি সাদা ফুল, সুগন্ধি। কবির ভাষায়, ‘বাদল বাতাস মাতে মালতীর গন্ধে।’ ফুলের বৃতি ৫, লম্বা ওচোখা। দলনলের আগায় ৫ পাপড়ি, সরু ও লম্বা, মোড়ানো। বর্ষায় মালতী ফোটে। আয়ুর্বেদিকশাস্ত্রে এর ব্যবহার আছে। এই ফুলের নাম নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি। এই ফুল একেক জনের কাছে একেক নামে পরিচিত। সবচেয়ে প্রচলিত ভুলটি হচ্ছে আমরা একে মাধবীলতা নামেও ডাকি। আসলে এর কোনো বাংলা নাম ছিলো না। শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ মধুমঞ্জরী লতা নাম দিয়ে গাছটিকে আপন করে নিয়েছিলেন।

‘স্মরণচিহ্ন কত যাবে উন্মুলে

মোর দেয়া নাম লেখা থাক ওর ফুলে মধুমঞ্জরীলতা’

ফুলের নাম- মধুমঞ্জরী লতা, মধুমালতী, মাধুরীলতা

বাড়ির ফটক বা ঘরের উপর বেশ জাকিয়ে বসে। শীতে পাতা কমে যায়। সাদা ও লাল থোকা থোকা ফুল। পাপড়ির নলটি বেশ লম্বা। বছরে কয়েক দফা ফুল ফোটে। ঘন সবুজ পাতার মাঝখানে ঝুলন্ত সাদা-লাল ফুল সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সন্ধ্যায় নতুন ফুল ফোটে আর হালকা সুবাস ছড়ায়। গাছপালা তরুলতা অনুসারে- ফুলের নাম- মাধবী বা মাধবীলতা। বোটানিক্যাল নাম মাধবী বা মাধবীলতার অন্যান্য নাম- মপ, কামী, পুষ্পেন্দ্র, অভীষ্টগন্ধক, অতিমুক্ত, বিমুক্ত, কামুক ও ভ্রমরোৎসব।

এক সময় ময়মনসিংহে মাধবী প্রচুর পাওয়া যেত।  মাধবী বৃক্ষারোহী লতা এবং দীর্ঘজীবী। ডাল ছোট ছোট এবং ঝোপঝাড় হয়ে যায়। এভাবে বহুবর্ষী হলে ধীরে ধীরে মূল লতাটি বেশ মোটা হয়ে যায়। ডাল দু-তিন বছর পরপর কেটে দিতে হয়, তারপর লতা যতই বাড়তে থাকে ততই নতুন নতুন ডালপালা গজায় ফুল বেশি ফোটে। এর মোটা মোটা ডালের ছাল মেটে রঙের, ভেতরের কাঠ লালচে ও শক্ত। পাতা বিপরীতমুখী, আয়তকার, বোঁটার দিক থেকে আগা ক্রমশ সরু, সাধারণত ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি লম্বা হয়। অনেকটা চাঁপা ফুলের পাতার মতো। বাগানের শোভার জন্য যতœ করে মাধবী লাগানো হয়। তবে এই লতা গাছটি এখন প্রায় দুষ্প্রাপ্য।

মাধবীর ফুল গুচ্ছবদ্ধ ও বিন্যাস সুসংবদ্ধ। মুকুলগুলো সূক্ষ্ম রোমে ভরা। ফুল সাদা রঙের, পাঁচটি পাপড়ি এবং তার মধ্যে পঞ্চম পাপড়িটির গোড়ার দিক হলদেটে। ফুল দেখতে তিল ফুলের মতো এবং খুব সুগন্ধি। বসন্ত ও গ্রীষ্ম এই ফুলের ঋতু হলেও কখনো কখনো বর্ষা পর্যন্ত ফোটে। ফুল থেকে ফল হয়, বীজ থাকে ২/৩টি এবং তা রোমশ। মাধবী অযত্নে বাড়ে, বীজ থেকে চারা হয়, ডাল কেটে মাটিতে পুঁতে রাখলেও চারা পাওয়া যায়।

আষাঢ় শ্রাবন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা কবিতা সবার মুখে মুখে - ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে ওগো আজ তোরা যাসনে গো যাসনে ঘরের বাহিরে।’

এটা ছোটদের জন্য রবীন্দ্রনাথের সাবধান বাণী কি? বর্ষা ঋতুর সূচনায় গ্রামীণ জনপদের একটি চিত্র মাত্র। প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে বাইরে গিয়ে ছেলেমেয়েরা আটকা পড়বে, অসুখ বাঁধাবে এটাই হয়তো কারণ। তো এই কবিতার মধ্য দিয়ে আমরা বর্ষা ঋতুর একটি চিত্র পাই। আমাদের দেশ ষড়ঋতুর দেশ হলেও প্রধানত গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীতকালই চোখে পড়ার মতো, অনুভব করার মতো। শরৎ, হেমন্ত আর বসন্ত কখন আসে আর কখন যায় তেমন একটা টেরই পাওয়া যায় না।

আষাঢ় আর শ্রাবণ এই দুই মাস হচ্ছে ক্যালেন্ডারের বর্ষাকাল। কিন্তু বাস্তবে আষাঢ় আসার বহু আগে থেকেই চৈত্রে বৈশাখে কালবোশেখীর সাথে শুরু হয়ে যায় বৃষ্টির ছাট।  বর্ষাঋতুর কথা। এ সময়ে বৃষ্টির পানিতে এবং উজান থেকে নেমে আসা পানিতে খাল বিল সব তলিয়ে যেতে শুরু করে। নদীগুলো পানিতে ভরে যায়Ñ অনেক সময় উপচে পড়ে বন্যাও দেখা দেয়। বন্যা হয় আমাদের ক্ষতির কারণ। শ্রাবণ মাস যখন আসে তখন আমাদের দেমের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। গ্রামীণ জনপদ তখন বর্ষার পানিতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে। গ্রামীণ বাড়িগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে ওঠে। তখন চলাচলের বাহন হয় নৌকা। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগের মতো বর্ষাকাল আর হয় না কারণ উজানে বহু নদীতে বাঁধ দেওয়ায় পানি আটকে গেছে। ফলে বর্ষার সৌন্দর্য অনেকটাই ¤¬ান হয়ে গেছে। এরপরও ক্রমাগত বৃষ্টি আর নদীর পানির স্রোতধারা আমাদেরকে ভিন্ন একটি আমেজ এনে দেয়। বৃষ্টি আমাদের মনে ও মননে একটি নতুন অনুভূতি আনে। বৃষ্টি সবারই ভালো লাগে শিশু-কিশোর বয়সে তো বৃষ্টিতে ভিজতে মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বৃষ্টি আমাদের প্রকৃতিকে যেমন ফলে ফসলে ভরিয়ে দেয় তেমনি আমাদের মন-মানসকেও ¯পর্শ করে।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত