আমার কথা

সাদিক ইভান (১৬), ঢাকা

Published: 2017-05-06 20:24:27.0 BdST Updated: 2017-05-06 21:38:15.0 BdST

‘আমরা শক্তি আমরা বল আমরা ছাত্র দল’, কবিতার লাইনটি পড়ে ছাত্র হিসেবে আগে গর্বে বুক ফুলে উঠত। কিন্তু এখন নিজের ছাত্রত্ব নিয়ে ক্রমেই চুপসে যাচ্ছি।

কেন তা হচ্ছে সেটা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই শুরু করি। ২০০৯ সালে প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিই। প্রথমবারেই তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় আমাকে। পরীক্ষার মাস দুই আগে মন্ত্রণালয় আমাদের উপর একটি নোটিস চাপিয়ে দিয়েছিল। একদিনে দুটো করে পরীক্ষা দিতে হবে। সেই অনুযায়ী তিনদিনেই শেষ হয় আমাদের পিএসসি পরীক্ষা। এরপর থেকে পাবলিক পরীক্ষার নাম শুনলেই বেশ আতঙ্কে থাকতাম, না জানি আবার কবে কোন হুকুম জারি হয়!  

আট বছর পরে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী আমি। আবার সেই ভয়ানক ব্যাপারটি আমাদের চমকে দিয়েছে। ভয় পাইয়ে দিয়েছে। এবার এক আচমকা নোটিসে জানানো হয়েছে, পরীক্ষায় ছয়টির বদলে সাতটি সৃজনশীল লিখতে হবে। পরীক্ষার অল্প কদিন আগে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলন করেও এটা রদ করা যায়নি।

সাতটি সৃজনশীলের জন্য পরীক্ষার সময় বাড়িয়ে দেওয়া হলেও বিষয়টি রপ্ত করার মত পর্যাপ্ত সময় আমাদের দেওয়া হয়নি। পাঁচ বছর ধরে ছয়টি সৃজনশীলই চর্চা করেছি আমরা। আর তাতেই আমরা সময় কুলিয়ে উঠতে পারতাম না। সেখানে হঠাৎ করে সাতটি সৃজনশীলের নোটিস, বড় ধরণের ধাক্কা দিয়েছে আমাকেসহ আমার সহপাঠীদের।

পরীক্ষার ফলে এর প্রভাব পড়লে আমাদেরই বয়ে বেড়াতে হবে সেই ক্ষত। আবার কেউ হয়তো আশানুরূপ ফল না হলে চলে যায় আত্মহননের পথে।

এই ধরণের ঘটনা শুধু আমাদের সাথেই ঘটেনি। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে জানানো হয়, সমাপনী পরীক্ষা আর নেওয়া হবে না। কদিন পরই আবার জানানো হয়, পরীক্ষা আগের মতই অনুষ্ঠিত হবে। ছোট ছোট শিশুদের সঙ্গে এ ধরণের আচরণ খুব নেতিবাচক মনে হয়েছে আমার কাছে। অন্তত বড়দের কাছে আমরা এর চেয়ে একটু বেশি বিবেচনা আশা করতেই পারি।   

এই পাবলিক পরীক্ষা নিয়েই এরপর অবাক হলাম মাস ছয়েক আগে, নভেম্বর মাসে। শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষায় শিক্ষার্থী মূল্যায়নে ‘স্টান্ডার্ডাইজেশন’ (প্রমিতকরণ) নামে নতুন পদ্ধতি প্রকাশ করেন। এই পদ্ধতিতে প্রতিবছর কত শতাংশ শিক্ষার্থীকে জিপিএ পাঁচ দেয়া হবে তা সরকারিভাবে নির্ধারণ করা হবে।  

এসবের মধ্যেই চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় ফুটে ওঠে পরীক্ষা সংশ্লিষ্টদের কর্মচিত্র। পদার্থ বিজ্ঞান প্রথম পত্রের পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত সময় দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিট হলেও ভুল করে প্রশ্নপত্রে লেখা হয় দুই ঘণ্টা ২০ মিনিট। সেই অনুসারে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে খাতা নিয়ে নেন শিক্ষক। ১৫ মিনিট আগেই খাতা নিয়ে নেওয়ায় উত্তর লিখে শেষ করতে পারেনি অনেক পরীক্ষার্থী। কেঁদেকেটে হল থেকে বের হয় তারা। যদিও শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন এর ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেবেন।

কিন্তু ক্ষতিপূরণটা হবে কীভাবে? 

পরীক্ষা নিয়ে আর বেশি কিছু বলার নেই। সকলেই দেখছেন শুনছেন। সমালোচনা আর প্রতিবাদ করছেন। সংবাদ হচ্ছে। কিন্তু ভূক্তভোগী আমরা যারা, তারা কী করতে পারি?

এই এইচএসসি পরীক্ষার কয়েকটি খাতার ছবি সম্প্রতি ফেইসবুক জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে একজন শিক্ষিকা বাসে বসে পাবলিক পরীক্ষার খাতা দেখছেন। অন্যান্য পরীক্ষার খাতা শিক্ষিকা যেখানে খুশি সেখানে দেখুন, আপত্তি নেই। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার খাতা? আমরা কী আরেকটু গুরুত্ব আশা করতে পারি না?

ঐ ভিডিওর নিচে একাধিক কমেন্ট দেখলাম। সবার একই ধরণের মন্তব্য যে, খাতা দেখার জন্য শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়না। তাই শিক্ষকরা তাড়াহুড়া করে খাতা দেখেন, ইত্যাদি।

একজন তো লিখেছেন। ‘আমার বাবা শিক্ষক। ওনাকে ৩০০ খাতা মূল্যায়নের জন্য মাত্র সাতদিন সময় দেওয়া হয়েছে। একজন শিক্ষকের সারাদিনের ব্যস্ততার পর এত খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আমিও বাবার সঙ্গে খাতা দেখে দিই।’ এ ধরণের পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের মেধা কেমন যাচাই হবে তা নিয়ে সন্দিহান আমি।

দুদিন আগে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো। গতবছরের তুলনায় পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ৯৪ শতাংশ আর সব বিষয়ে এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে পাঁচ হাজার। একজনও পাস করেনি এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৪০টি। তবুও এটা ফল বিপর্যয় নয়?   

এবার খাতা মূল্যায়নের জন্য একটি নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিলো। সেই মতো খাতা দেখেই কী এবার এ বিপর্যয়? নাকি হার কমিয়ে মান বাড়ানো? মান বাড়ুক আমিও চাই তবে এতদিন কেন এই নির্দেশিকা মানা হয়নি, এটা আমার প্রশ্ন।

সরকারি বাজেটে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই নিশ্চয় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাই আশা রাখি, অসতর্কতা, অবহেলা কিংবা অদক্ষতায় একজন শিক্ষার্থীর জীবনও যেন হুমকিতে না পড়ে। অকালে ঝরে না যায়। তাই আশা করব, বড়দের বিবেচনা বাড়ুক! 

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত