বিশ্বজুড়ে

মুহাম্মাদ শরিফুজ্জামান বাপ্পি(১৬), রাজশাহী

Published: 2020-03-02 14:19:12.0 BdST Updated: 2020-03-31 20:26:34.0 BdST

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তো বটেই বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, পুরো বিশ্বে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লক্ষ ৫-১৭ বছর বয়সী শিশু শ্রমিক রয়েছে। ইউনিসেফ বলছে, চলতি বছরে আরো ১০ কোটি শিশুকে শিশুশ্রমে যুক্ত করানো হবে। 

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শিশু বিষয়ক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলো শিশুশ্রম রোধে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান যাদের শ্রমিকেরা অধিকাংশই শিশু তাদের কাছে শিশু বিষয়ক মানবাধিকার সংস্থাগুলো কার্যত অসহায়। 'কোকো'র চকোলেট ফ্যাক্টরি সেটার অন্যতম উদাহরণ।

কোকো চকোলেট উৎপাদনকারী অন্যতম একটি ইন্ডাস্ট্রি। জনপ্রিয় নেসলে, হার্সেই, মার্সের মতো ব্যান্ডগুলোর কাছে চকোলেট সরবরাহ করে কোকো।

বিশ্বের চকোলেট সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পশ্চিম আফ্রিকার কোকো ফার্ম থেকে আসে যেখানে দুই মিলিয়নেরও বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ২০১৫ সালে মার্কিন দপ্তরের প্রতিবেদনে এটি উঠে আসে। এখন পরিস্থিতি আরো ভয়ানক।

চকোলেট পছন্দ করে না, এরকম মানুষ পাওয়া সত্যিই কঠিন। সুস্বাদু এই চকোলেটগুলোতে লুকিয়ে আছে পশ্চিম আফ্রিকার কোকো ফার্মে নিয়োজিত লক্ষ লক্ষ দরিদ্র শিশুদের কষ্ট।

পশ্চিম আফ্রিকার এই কোকো ফার্মগুলো বিশ্বে চকোলেট সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ২০ বছর আগে বিশ্বের বৃহত্তম চকোলেট সংস্থাগুলো শিশুশ্রম নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বটে, কিন্তু সেগুলো কার্যত বাস্তবায়িত হয়নি।

বৃহৎ লাভের আশায় চকলেট উৎপাদনকারী সংস্থাগুলো দরিদ্র শিশুদের দিয়ে যে কাজ পরিচালনা করেন তা সত্যিই সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক।

২০০১ সালে এই চকোলেট উৎপাদনকারী সংস্থাগুলো মার্কিন কংগ্রেসের চাপে পশ্চিম আফ্রিকার কোকো সরবরাহকারীদের "শিশুশ্রমের সবচেয়ে খারাপ রূপ" নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি স্বাক্ষর করেছিলেন। সংস্থাগুলো চার বছরের মধ্যে এই প্রকল্প শেষ করতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু তারা তাদের আর্থিক লাভের কথা বিবেচনা করে সেটা করেনি।

আন্তজার্তিক শিশু-বিষয়ক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পাশাপাশি পশ্চিম আফ্রিকার সরকার এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো শিশুশ্রম নির্মূলের জন্য কিছুটা দায়িত্ব বহন করে। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে শক্তিশালী কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

মার্কিন শ্রম দফতরের মতে, কোকোতে ২০ লক্ষ শিশু শ্রমিকের সিংহভাগ তাদের পিতামাতার খামারে জীবনযাপন করছে। বিপজ্জনক কাজ যেমন: ভারী বোঝা বহন করছে, কীটনাশক স্প্রে করছে ইত্যাদি।

কোকোতে কর্মরত শিশুদের দিয়ে ভারী কাজ করানো হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শিশু যাদের বিভিন্ন দেশ থেকে পাচার করে আনা হয়েছে তাদের কোনো মজুরি দেওয়া হয় না। যাদের দেওয়া হয় তাদের মজুরির পরিমাণটা খুবই কম। এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের অল্প মজুরি দেওয়া হয় যা দিয়ে তাদের সংসার চলে না, ওয়াসিংটন পোস্টকে এমনটাই জানান স্থানীয় এক শ্রমিক।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নিম্ন মানের। আপাতদৃষ্টিতে কোকো ফার্ম স্থানীয় মানুষদের আশীর্বাদ হলেও তা শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে।

প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের পর্যাপ্ত মজুরি না দেওয়ায় তারা তাদের শিশুদের কাজে ভেড়াচ্ছে। শ্রমিকদের পর্যাপ্ত মজুরি দেওয়া শিশুশ্রম নিরসনের একটি সমাধান হতে পারে।

পুষ্টি পাবার আশায় নয়, মনোরঞ্জনের জন্য আমরা একে অপরকে চকোলেট দিয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের এই বিলাসিতাই যে কত শিশুর কষ্টের কারণ তা ভেবেই আঁতকে উঠতে হয়।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত