শিশু অধিকার নিশ্চিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি কতটা? | hello.bdnews24.com
অন্য চোখে

মুহাম্মাদ শরিফুজ্জামান বাপ্পি(১৭), রাজশাহী

Published: 2021-08-31 00:56:17.0 BdST Updated: 2021-08-31 00:56:29.0 BdST

শিশু অধিকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার শিশু অধিকার সনদের সঙ্গে মিল রেখে ২০১৩ সালে শিশু আইন-২০১৩ পাশ করে। এই আইনের আলোকে শিশু অধিকার নিশ্চিতে বাংলাদেশ সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে কাঠামোগত অনেক উদ্যোগ নেয়। যদিও সামাজিকভাবে শিশু অধিকারের বিষয়টি এখনো বেশ অবহেলিত।

প্রাপ্তবয়স্কদের মতো শিশুদেরও যে সবক্ষেত্রে সমান অধিকার রয়েছে সেটা অনেকেই মেনে নিতে চায় না। সামাজিকভাবে এই রকম ধারণা শিশু অধিকার নিশ্চিতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউনিসেফের প্রতিবেদন বলছে, আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি শিশু রয়েছে। সংখ্যার হিসাবে প্রায় ১৭ লাখ শিশু শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত আছে।

আঁতকে ওঠার মতো তথ্য হচ্ছে, এই ১৭ লাখ শিশুর প্রতি চার জনের মধ্যে একজন শিশুর বয়স ৬ থেকে ১১ বছরের মধ্যে! স্বল্প আয়ের পরিবারের কত মেয়ে শিশু যে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে তার ইয়ত্তা নেই।

শিশু অধিকার নিশ্চিতে বাংলাদেশের অন্যতম আরেকটা প্রতিবন্ধকতা হলো বাল্যবিয়ে। যদিও ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে বাল্যবিয়ের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে তবুও সাধারণ মানুষের মানসিকতা এখনো পরিবর্তিত হয়নি। অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা মেয়ে শিশুদের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে। অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে একটি জীবন।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অধিকারকে পাশ কাটিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা ভাবছে সেটা অনেকাংশেই বাস্তবায়িত হবে না বলে আমার মনে হয়। ৪০ শতাংশ মানে প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত না করেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

এটা স্বীকার করতেই হয়, শিশুদের সার্বিক উন্নয়নে এবং শিশু বান্ধব বিভিন্ন নীতি ও আইন প্রণয়নে বাংলাদেশ সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শিশুবিষয়ক বিভিন্ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে।

শিশু অধিকার বিষয়ে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নীতি ও আইন রয়েছে। শিশুশ্রম নিরসন আইন, শিশুনীতি, শিশু আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রভৃতি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এই আইন ও নীতিগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এইসব আইনগুলো বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশে শিশুদের আলাদা কোনো মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তর নেই।

ইউনিসেফসহ বাংলাদেশে যেসব সংগঠনগুলো শিশুদের নিয়ে কাজ করছে তারা প্রতিনিয়ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তরের দাবি জানিয়ে আসছেন। এমনকি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদেও এমনটা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউনিসেফ বলছে, শিশু অধিকার নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবন্ধকতা হলো গণমাধ্যমের অসহযোগিতামূলক আচরণ। তাদের মতে, শিশুদের বিষয়গুলো গণমাধ্যমে মাত্র তিন শতাংশের কম প্রতিফলিত হয়। এই তিন শতাংশের মধ্যেও, এক শতাংশের কম পূর্ণাঙ্গ ও গভীর বিষয়গুলি তুলে ধরে গণমাধ্যম।

হাতেগোনা কয়েকটা মূলধারার গণমাধ্যম শিশুদের মতকে তুলে ধরে। শিশুরা কী বলতে চায় তারা সেটা শোনে এবং প্রচার করে। মূলধারার অনেক মিডিয়া এমনটা তো করেই না, বরঞ্চ শিশু বিষয়ক বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। শিশুদের কথাও যে গুরুত্বপূর্ণ এটা অনেক গণমাধ্যম বিশ্বাস করে না।

একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের শিশুদের ওপর নির্ভর করতে হয় না। এর ফলে অনেকসময়ই তারা শিশু অধিকারের বিষয়গুলো কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে। শিশু অধিকার নিশ্চিতে এটাও এক ধরণের প্রতিবন্ধকতার প্রতিনিধিত্ব করে।

শিশু আইন-২০১৩ অনুসারে, জাতীয়ভাবে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশু কল্যাণ বোর্ড গঠন করতে হবে, যে বোর্ডগুলো উক্ত অঞ্চলের শিশুদের কল্যাণে কাজ করবে। বাস্তবে আমরা দেখতে পাই, উপজেলা পর্যায়ে তো দূরে থাক, জেলা পর্যায়ে শিশু কল্যাণ বোর্ড গঠিত হয়নি। অনেক জায়গায় গঠিত হলেও চোখে পড়ার মতো কোনো কার্যক্রম নেই।

উক্ত আইনের চতুর্থ অধ্যায়ে লেখা আছে, প্রত্যেক থানায় শিশু বিষয়ক ডেস্ক থাকতে হবে। সার্বক্ষণিকভাবে সেই ডেস্কে একজন শিশু বিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা থাকবেন যিনি ন্যূনতম সাব ইন্সপেক্টর পদে নিয়োজিত। বাস্তবে হাতে গোনা কয়েকটা থানা ছাড়া অধিকাংশ থানায় এমন সু্বিধা নেই। এমনকি অধিকাংশ থানায় শিশু অধিকারের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে অত্যন্ত কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।

এছাড়াও উক্ত আইনে শিশু আদালত, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাসহ বেশ কয়েকটা বিষয় থাকলেও সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।

শিশু অধিকার নিশ্চিতে বাংলাদেশ সরকারের সামগ্রিক অগ্রগতি হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। প্রতিবন্ধকতা ও সামগ্রিক সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ শিশু অধিকারের বাস্তবায়ন নিশ্চিতে এগিয়ে যাবে বলে আমরা আশা রাখি।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত