গৃহকর্মী নির্যাতন : “সবাই আপোস চাইলে কিছু করার থাকে না” | hello.bdnews24.com
অন্য চোখে

আজমল তানজীম সাকির (১৭), ঢাকা

Published: 2021-07-29 22:54:33.0 BdST Updated: 2021-07-29 23:22:31.0 BdST

বাংলাদেশে কিছুদিন পরপরই শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে কিছু নির্যাতন থাকে অতি বর্বর ও অমানবিক। নির্যাতিত শিশুদের অনেকেই বিচার পায় না। না পাওয়ার কারণ, গৃহে সহিংসতাসহ নানা বিষয়ে হ্যালোর মুখোমুখি হয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রধান অ্যাডভোকেট সালমা আলী। 

হ্যালো: সম্প্রতি আমরা দেখেছি, গৃহকর্মী নির্যাতন বা অন্যান্য ডমেস্টিক ভায়োলেন্স অনেক বেড়ে গিয়েছে। তো আপনারা কি এই ধরণের কেস এখন তুলনামূলক বেশি পাচ্ছেন? 

অ্যাডভোকেট সালমা আলী: না, আমরা কেস বেশি পাচ্ছি না। কারণ, অ্যাকসেস টু জাস্টিস যেটা সেটা কিন্তু নেই। ওরা আমাদের কাছে আসতে পারে না। হয়তো মাঝে মাঝে ফোন আসে। আমাদের কাছে আসে, কিন্তু আগের মতো না। ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে আমাদের আইনজীবীরা বাড়ি বাড়ি যেত। আইনজীবীরাও এখন বের হতে পারে না। তাদের পরিবারের অনেকে আক্রান্ত।

হ্যালো: এই ধরনের কেস নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই...

অ্যাডভোকেট সালমা আলী: গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনাগুলো একটা ঘরের ভেতরে ঘটে। আমরা যতগুলো নির্যাতনের শিকার হওয়া মেয়েদের উদ্ধার করি তাদের পেছনের গল্প খুঁজতে গেলে দেখা যায় যে স্ত্রী বা স্বামী-স্ত্রী একসাথে নির্যাতন চালায়। গত সপ্তাহে আমরা একজনকে উদ্ধার করলাম। যেখানে স্ত্রী তাকে বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন করেছে। শিক দিয়ে...মানে...খুব অদ্ভুতভাবে। অনেক সময় দেখা যায় স্বামীরা নির্যাতন করেন না। কিন্তু স্বামীদের যে স্ত্রীরা সন্দেহ করে তারা অনেক সময় মনে করে যে কাজের মেয়ের সাথে তার স্বামীর কোনো অনৈতিক সম্পর্ক আছে। কাজের মেয়ে যখন অস্বীকার করে তার মানে সে জড়িত।

 

হ্যালো: আইনি সেবা নিতে গেলে তারা কি ধরণের বাধার মধ্যে পড়ে?

অ্যাডভোকেট সালমা আলী: কিছুদিন আগেই একটা অভিযোগ এসেছে যে হটলাইনে তারা ফোন করলে তারা সেই ধরণের (সমাধান) পায় না।এখানে আরেকটা বড় সমস্যা হল প্রমাণের অভাব। প্রমাণ অনেক সময় পাওয়া যায় না। আবার আমরা যদি মামলা করে ফেলি তখন দেখা যায় আদালতের বাইরে টাকা-পয়সা দিয়ে আপোস করে ফেলে, পুলিশকে টাকা-পয়সা দিয়ে মামলাটা হালকা করে ফেলে। এখানে অনেক বিষয় আছে। কারণ এখানে শক্তিশালী ও টাকা-পয়সাওয়ালা একটা দল থাকে আর বিপরীতে অসহায় একটা দল থাকে। গ্রাম এলাকা থেকে যখন কোনো ঘটনার শিকার হওয়া কেউ আসে তখন ঐ এলাকার চেয়ারম্যান পর্যন্ত আসামীর পক্ষে চলে যায়। সবাই আপোসের দিকে চলে যেতে চায়। তখন আমাদের কিছু করার থাকে না। ২০০৩ সালে যে শ্রম আইন হয়েছে সেখানেও কিন্তু শিশু গৃহকর্মীদেরকে শিশু শ্রমিকের ভেতর রাখা হয়নি। ২০১৩ সালে ন্যূনতম বয়স ঠিক করে দেওয়া হলেও এর কোনো মনিটরিং নাই। আমাদের কত যে গৃহকর্মী আছে তারও হিসাব নাই। কয়েক বছর আগে জেনেছিলাম, এক লক্ষ পচাশি হাজার গৃহকর্মী আছে। কিন্তু আসলে আরও অনেক বেশি হবে।

হ্যালো: গৃহকর্মী আদুরী নির্যাতনের কেসটা আপনি লড়েছিলেন। ঐ কেসটাতে কি আপনার আদালতের বাইরে কোনো বাধা এসেছিল?

অ্যাডভোকেট সালমা আলী: আদুরীর কেসটা অনেক ইউনিক ছিল। ইউনিক ছিল কারণ ঘটনাটা ঢাকায় ঘটলেও আদুরীর এলাকায় ভীষণ নাড়া দিয়েছিল। তারা আন্দোলনও করেছিল। আদুরী আমাদের আশ্রয় কেন্দ্রে ছিল। আমাদের কাছে থাকাতে আইনি প্রক্রিয়া আমাদের তত্ত্বাবধায়নেই হয়েছে। আদুরীর স্থানীয় সমাজ এখনো সোচ্চার। এটা খুব সাহায্য করেছিল আমাদের। আরেকটা বড় বিষয় হল, আসামী মহিলা ছিল। লবিং করা, টাকা-পয়সা দিয়ে আপোস করার মতো কেউ ছিল না তার। তাই আদালতের বাইরের চাপ ছিল না।

হ্যালো: অনেক সময় নির্যাতিতদের বিবৃতিও বদলে ফেলতে দেখা যায়।

অ্যাডভোকেট সালমা আলী:  হ্যাঁ, অনেক সময় বিবৃতিও বদলে দেয়। বলে, “আমি আগে মিথ্যা কথা বলেছি।” তখন একটা ড্রামা শুরু হয়ে যায়। আমি এটাকে বলি কোর্টরুম ড্রামা। তবে এসব মামলায় যদি একটু উচ্চ প্রোফাইলের লোক হয়, এ ধরণের ঘটনা হয়। অনেক মামলা এখনো ঝুলে আছে। কারণ যারা শিকার তাদের পক্ষের কাউকে পাওয়া যায় না। এখন কেউ যদি মনে করে বিচার লাগবে না, ক্ষতিপূরণ হলেই হবে তখন আমাদের তো কিছু করার থাকে না।

হ্যালো: গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর তো আমরা সেগুলোই জানতে পারি যেগুলো পত্রিকায় আসলে, অনলাইনে ভাইরাল হলে বা নির্যাতিতকে রাস্তা থেকে কুঁড়িয়ে পেলে। অনেক ঘটনা তো লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। তাদের অ্যাকসেস টু জস্টিস কেন নিশ্চিত করা যায় না?  

অ্যাডভোকেট সালমা আলী: আমাদের যে হটলাইনগুলো ছিল (১০৯, ৯৯৯) সেগুলোকে আরো সচেতন হতে হবে। এগুলো নিয়ে অ্যাপ বানাতে হবে। এটা নিয়ে কাজ হচ্ছিল, এখন কী অবস্থা জানি না। হলেই বা কী! আমার দেশে জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশ এত কম! পুলিশের নজরদারিতার অভাব আছে।

অনেক থানার মধ্যে নারীবান্ধব পরিবেশ নাই। কারণ তাদের জেন্ডার নিয়ে প্রশিক্ষণ নাই। একজন নারীর সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করা লাগবে এমন প্রশিক্ষণ নাই। আর সব কিছুতে এত দীর্ঘসূত্রিতা, বাধা... ।

হ্যালো: ঢাকা শহরে প্রত্যেক বাড়িওয়ালাকে তার বাড়ির ভাড়াটের তথ্য থানায় জমা দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। একই ভাবে গৃহকর্মী নিয়োগের সময় কি তাদের তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করা যায়? তাহলে তো নজরদারি সহজ হবে বলে মনে হয়। এই নজরদারি কিভাবে বাড়ানো যায়?

অ্যাডভোকেট সালমা আলী: এটা পরিস্কার বলা আছে যে প্রত্যেককে করতে হবে। গৃহকর্মীর ছবিসহ নিবন্ধন করতে হবে। অনেকে বলে, ও (গৃহকর্মী) যদি চুরি করে বা কিছু করে তখন কীভাবে ধরবে? তাই নিবন্ধন করতে হবে। আমি মনে করি এটা দুই কারণে করা উচিত। ঐ কারণের পাশাপাশি পুলিশ নজরদারির জন্যও তথ্য রাখা দরকার। আমি চাইল্ড লেবার মনিটরিং কমিটির কো-চেয়ার। ঐদিনের আগুনের যে ঘটনাটা হল (সজীব ফুডসের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা) সেটা হওয়ার পরেও নজরদারির ব্যাপারটা এসেছে। কলকারখানা অধিদপ্তর থেকে বলে আমাদের লোকবল কম। আরে, তোমার তো প্রতিদিন সব জায়গায় যাওয়ার দরকার নেই। তোমরা যাবা হঠাৎ করে যেকোনো একটায়।

হ্যালো: শেষ প্রশ্ন করছি। আপনারা কীভাবে নির্যাতিতদের সাহায্য করে থাকেন?

অ্যাডভোকেট সালমা আলী: আমাদের মহিলা আইনজীবী সমিতি হল পেশাদার সংগঠন। আমরা কাজ করি আমাদের পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকে। আমাদের সামাজিক ও পেশাগত দায়বদ্ধতা হল সমাজে যাদের দরকার হবে, তাদের সাহায্য করতে হবে। আমরা শুধু কোর্টে গিয়ে কেস লড়ি না। আমরা তাকে মানসিক কাউন্সেলিং করি, সে চাইলে তার আশ্রয়ের ব্যবস্থা করি। কিন্তু আমাদের কাজও অনেক কমে গিয়েছে যার কারণ হল করোনা।  

হ্যালো:
অনেক ধন্যবাদ।

অ্যাডভোকেট সালমা আলী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত