শহীদ জননী থেকে সারা বাংলার জননী - hello
অন্য চোখে

তাসনুভা মেহ্জাবীন (১৩), খুলনা

Published: 2021-05-03 12:37:27.0 BdST Updated: 2021-05-03 12:37:27.0 BdST

বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা উল্টালেই একটি লাইন "আজ বিকেলে রুমী ক্রিকেট খেলা দেখে তার বন্ধুদের বাসায় নিয়ে আসবে হ্যামবার্গার খাওয়ানোর জন্য।"

পড়ে মনে হবে সুন্দর একটি পরিবারের ছোট গল্প, স্বাভাবিক জীবনের কথা বার্তা নিয়ে লেখা একটি সুন্দর দিনলিপি। কিন্তু পাতা উল্টাতে থাকলে দেখা যাবে একই চরিত্রগুলোরই কত ধরনের পরিবর্তন, কত উত্থান-পতন। সুন্দর একটি পরিবারে হানা দিয়েছিল কোনো এক অশুভ ছায়া, তারই যেন উপাখ্যান বইটিতে।

বলছি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের লেখা ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটির কথা। তার লেখা অনেক বইয়ের মাঝে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে এই বইটি। মুক্তিযুদ্ধের দিনে লেখা বইটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনলিপি।

জাহানারা ইমাম জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৯ সালের ৫ মে। ভারতের মুর্শিদাবাদের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ আব্দুল আলী ও সৈয়দা হামিদা বেগমের ঘর আলো করেন তিনি।

দেশের তরে সন্তানকে উৎসর্গ করা মা হিসেবে তার এমন এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দেখে অশ্রু আসে নি এমন পাঠক খুব কম আছে। তার দিনলিপির মুখ্য একটি চরিত্র ছিল শফী ইমাম রুমি, তার সন্তান। মাতৃভূমি রক্ষার ডাককে উপেক্ষা করতে দেননি সন্তানকে। যার মা হিসেবেই তিনি উপাধি পেয়েছেন 'শহীদ জননী'। মুক্তিযুদ্ধের সময় কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নিজের স্বামী ও সন্তান ছাড়াও হারিয়েছেন অনেক কিছু।

যুদ্ধের পরে ছোট্ট সন্তান জামীকে নিয়ে তার জীবনচলা থেমেছিল না। প্রচণ্ড মানসিক দৃঢ়তাই তাকে করে তুলেছিল বিপ্লবী। সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি পেয়েছিলেন ১৯৮৮ সালে 'বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার' ও 'কমর মুষতারী সাহিত্য পুরস্কার'। এছাড়া ১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দেশ থেকে যেন মুছে না যায় সে প্রয়াসেই তিনি ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গড়ে তুলেন ১০১ সদস্যের একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ঘোষণা করার পরই মূলত তিনি এ কাজ করেছিলেন। তার এ কমিটির আয়োজনে ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ 'গণআদালত' এর মাধ্যমে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের 'নরঘাতক’ গোলাম আযমের প্রতীকী বিচার করা হয়। এমন সাহসী ও বিপ্লবী পদক্ষেপ থেকেই দেশবাসীর কাছে তার পরিচিত ছড়িয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে ধরা হয় তাকে।

গুণী এই লেখিকা, সংস্কৃতিবিদ ও রাজনৈতিক ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মরণব্যাধি ক্যান্সার কেড়ে নেয় জীবনপ্রদীপ।

জাহানারা ইমামের মত কিংবদন্তীদের আসলে মৃত্যু নেই। তারা বেঁচে থাকেন তাদের কর্ম দিয়ে। শহীদ জননী থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সারা বাংলার জননী।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত