ভাষা আন্দোলন যেভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস - hello
অন্য চোখে

মাসুদ রানা (১৭), জামালপুর

Published: 2021-02-21 23:58:49.0 BdST Updated: 2021-02-21 23:58:49.0 BdST

বাঙালির ভাষা আন্দোলন ৪৭ বছরের ব্যবধানে হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

বাঙালি জাতির ত্যাগকে স্বীকৃতি জানাতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে বাংলাদেশের মহান শহিদ ও মাতৃভাষা দিবস পুরো বিশ্বের মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

এর পেছনের গল্পটাও এত মসৃণ ছিল না। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রটি আরো দুটি অঞ্চলে ভাগ হয়। একটি পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান)।

দেশ ভাগের পর পাকিস্তান, ভারত দু প্রান্তেই ভাষা নির্ধারণ করাটা জরুরি হয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের স্থপতি ও গভর্ণর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক গণ-সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন তিনি। জিন্নাহ যেখানে স্পষ্ট করে ঘোষণা করেন "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা"।

তখন শতকরা মাত্র সাত শতাংশ মানুষ কথা বলত উর্দু ভাষায়। বাংলায় কথা বলতো ৫৪ শতাংশ। দ্বিগুণেরও বেশি ছিল উর্দু ও বাংলা ভাষাভাষীদের সংখ্যার তফাৎ।

জিন্নাহর ঘোষণার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়ে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ। তবে জিন্নাহ সেই প্রতিবাদকে আমলে নেননি। অটল থাকেন তার সিদ্ধান্তে। আরও দুটি আয়োজনে একই বক্তব্য দেন।

এরপর বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে পূর্ব বাংলার জনগণ। চার বছরে পাকাপোক্ত হয়ে এই দাবি জনরোষে পরিণত হয়।

পরিস্থিতি বেসামাল দেখে আন্দোলন দমাতে ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে পুলিশ। ঢাকা শহরে নিষিদ্ধ করা হয় মিছিলসহ সব ধরনের সভা সমাবেশ। গ্রেফতার করা হয় একের পর এক ছাত্র নেতাকে। তবুও দমে যায়নি শিক্ষার্থীরা। তারা সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার।

পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জমায়েত হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। বেলা ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে ঘটে তাদের সাহসের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। মিছিল নিয়ে রওনা হলে হঠাৎই লাঠিচার্জ ও গুলি বর্ষণ শুরু করে পুলিশ। ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ এবং আব্দুল জব্বার নামের তিন তরুণ মারা যান। পরে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন আব্দুস সালাম। নাম না জানা আরো অনেকেই প্রাণ দেন এই ভাষার জন্য।

পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ চলে তিন ঘণ্টাব্যাপী। পুলিশ গুলিবর্ষণ করেও ছাত্রদের স্থানচ্যূত করতে ব্যর্থ হয়। গুলিবর্ষণের খবর ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিকেল চারটার দিকে হাজার হাজার সাধারণ জনতা ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে জড়ো হতে থাকে। টনক নাড়িয়ে দেয় পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের। গণআন্দোলন ও জনরোষের মুখে চার বছরের মাথায় ১৯৫৬ সালে, সংবিধানে বাংলা ভাষাকেই পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় তারা। পৃথিবীর বুকে রচিত হয় নতুন ইতিহাস।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত