অন্য চোখে

রাফসান নিঝুম  (১৭), ঢাকা

Published: 2019-12-15 22:42:47.0 BdST Updated: 2019-12-17 13:02:57.0 BdST

১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী এদেশের নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ কালরাতে 'অপারেশন সার্চলাইট' এর মাধ্যমে নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালায়।

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করার আগে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা ঘোষণায় তিনি বলেন, “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।”

তার এ ঘোষণার পর থেকেই বাংলার দামাল ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

যুদ্ধ চলতে থাকা অবস্থায় ১৯৭১ এর ৩ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগ দেয় ভারতীয় বাহিনী। দুই বাহিনীর আক্রমণ প্রবল আকার ধারণ করে। কিভাবে এ যুদ্ধ থামানো যায়, সে পরিকল্পনা করতে ব্যস্ত হয়ে যায় পাকিস্তান সেনারা। জেনারেল নিয়াজী ভয় পেয়ে যান মিত্রবাহিনীর আক্রমণ দেখে৷ তাই তিনি চীন কিংবা আমেরিকা থেকে সাহায্য পাওয়ার জন্য আশাবাদী হোন।

এরপরে ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জ্যাকব ঢাকায় আসেন। সাথে করে তিনি আসেন আত্মসমর্পণের দলিল। জেনারেল নিয়াজী 'যুদ্ধ বিরতির খসড়া প্রস্তাব' হিসাবে এটিকে বর্ণনা করে।

দলিলের একটি ধারা 'ভারতীয় যৌথ কমান্ড এবং বাংলাদেশ বাহিনীর' কাছে আত্মসমর্পণ করছে পাকিস্তান বাহিনী এমন একটি ধারার বিপক্ষে ছিলেন রাও ফরমান আলী। তিনি ভেবেছিলেন এখানে আত্মসমর্পণ ও 'বাংলাদেশ' শব্দটি লেখা থাকবে না। কিন্তু এটি দিল্লী থেকে লেখাটা এভাবেই এসেছে বলেন জেনারেল জ্যাকব। জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণের শর্তযুক্ত দলিলটি দেখলেন। তবে কোন কথা বললেন না।

সে সময় ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে চলছিল আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার লেখা বই 'উইটনেস টু সারেন্ডা' তে লেখেন যে, “জনসম্মুখে পাকিস্তানি জেনারেলের অপমান দেখার জন্য আবেগতাড়িত বাঙালিরা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল!”

অতঃপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকার ঐতিহাসিক রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিকাল ৪ টা ১ মিনিটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে। সেই দলিলে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর পক্ষে কমান্ডার-ইন-চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেই ঐতিহাসিক মূহুর্তে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার কমান্ডার এ কে খন্দকার, ভারতের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জ্যাকব রাফায়েল জ্যাকব এবং পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় পাকিস্তানি নেভির কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরীফ ও পূর্বাঞ্চলীয় ভারতীয় বিমান বাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শাল প্যাট্রিক ডি কলাঘান।

আত্মসমর্পণের দলিল বাংলায় অনুবাদ করে নিচে হুবুহু তুলে ধরা হলোঃ

"পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশি যৌথ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে, পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সকল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো। পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সব আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে এই আত্মসমর্পণ প্রযোজ্য হবে। এই বাহিনীগুলো যে যেখানে আছে, সেখান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সবচেয়ে নিকটস্থ সেনাদের কাছে অস্ত্রসমর্পণ ও আত্মসমর্পণ করবে।

এই দলিল স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীন হবে। নির্দেশ না মানলে, তা আত্মসমর্পণের শর্তের লংঘন বলে গণ্য হবে, এবং তার প্রেক্ষিতে যুদ্ধের স্বীকৃত আইন ও রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আত্মসমর্পণের শর্তাবলির অর্থ অথবা ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো সংশয় দেখা দিলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশনের বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করছেন, এবং আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুবিধার অঙ্গীকার করছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীন বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও জন্মসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের সুরক্ষাও দেওয়া হবে।"

এ চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরই বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে রিভালভার তুলে দেন জেনারেল নিয়াজী।

রিভালভার তুলে দেওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার বই 'উইটনেস টু সারেন্ডার' এ লেখেন, "সে (জেনারেল নিয়াজী) রিভলবার তুলে দেবার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকেও তাদের হাতে তুলে দেয়া হলো!"

আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশের কাছে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) নিঃশর্তে পরাজয় মেনে নেয় পাকিস্তানিরা। সেই সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় থাকা প্রায় ৯৪ হাজার পাক সেনা যুদ্ধবন্দী হিসাবে গণ্য হয়। পাকিস্তানি সকল সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীই যুদ্ধবন্দী হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের আর কোথাও এত বড় বাহিনী কোথাও আত্মসমর্পণ করেনি।

দলিলে স্বাক্ষরের পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, ভারতের বেতার কেন্দ্র আকাশবাণীসহ বিভিন্ন রেডিও ও টেলিভিশনে এ সংবাদ প্রচার হতে থাকে। যার প্রধান শিরোনাম ছিল “পাকিস্তান বাহিনীর সারেন্ডার ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন।”

এভাবে পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত ও দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এ অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করা দেশের প্রত্যকটি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত