অন্য চোখে

মুহাম্মাদ শরিফুজ্জামান বাপ্পি(১৫), রাজশাহী

Published: 2019-12-14 18:14:55.0 BdST Updated: 2019-12-14 18:14:55.0 BdST

পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতিকে মেধাহীন করার লক্ষ্যে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে। প্রতিবছর আমরা শহীদদের স্মরণে এই দিনটাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করি।

গেরিলা ও যৌথবাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে পরাজয় আসন্ন। সদ্য স্বাধীন দেশ যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য এক জঘন্য ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা।

বাঙালিদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত দিক দিয়ে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার ঘৃণ্য নীলনকশা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরেরা। বাঙালি জাতিকে মেধাহীন ও বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়ায় পরিণত করাই ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অন্যতম উদ্দেশ্য।

লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসকসহ জ্ঞানীগুণী মানুষদের নিজ বাসভবন থেকে ধরে এনে নির্যাতন করার নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নির্ণয় এবং পাকিস্তানি দোসরদের কাছে তাদের ধরে আনার জন্য রাজাকার, আলবদর, আল শামশ ও শান্তি কমিটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানের যেকোনো অন্যায় অত্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা। এই কারণে পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের কাছে যথেষ্ট বিরাগভাজন।

১৪ ডিসেম্বর অসংখ্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে ২৫ মার্চ রাত থেকেই বুদ্ধিজীবী হত্যা করা শুরু হয়ে যায়।

বুদ্ধিজীবী নিধনের নীলনকশা পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে প্রণীত হয়। পাকবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর নির্দেশনায় নীলনকশা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন ব্রিগেডিয়ার বশির, লেফটেন্যান্ট কর্নেল হেজাজী, মেজর জহুর, মেজর আসলাম, ক্যাপ্টেন নাসির ও ক্যাপ্টেন কাইউম। এছাড়া আধাসামরিক আল বদর ও আল শামস বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডাররা এই ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে।

হাত পা বেঁধে ও চোখে কালো কাপড় পেঁচিয়ে বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন বধ্যভূমিতে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। পরবর্তীদের এসব বধ্যভূমি থেকে বুদ্ধিজীবীদের ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরেরা লাশগুলোকে এমনভাবে বিকৃত করে যে পরবর্তীতে সেগুলোকে শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে যায়।

ঢাকার রায়েরবাজার বধ্যভূমি, আলকেদি বধ্যভূমি, কালাপানি বধ্যভূমি, রাইনখোলা বধ্যভূমি, শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি, হরিরামপুর গোরস্তানসহ বেশ কয়েকটি স্থানে কয়েক শতাধিক ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায়।

বিভিন্ন পত্রিকায়, বইয়ে পড়ছি দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ১১১১ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। যাদের মধ্যে শিক্ষক ছিলেন ৯৯১ জন, সাংবাদিক ছিলেন ১৩ জন, চিকিৎসক ছিলেন ৪৯ জন, আইনজীবী ছিলেন ৪২ জন এবং অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক পেশার ছিলেন ১৬ জন। শুধুমাত্র ১৪ ডিসেম্বর রাতেই ২০০-৩০০ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা।

'ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি' ২৯ বছর ধরে সারাদেশে বধ্যভূমি খুঁজে চলেছে। সারা দেশে প্রায় ৯৪২টি বধ্যভূমি শনাক্ত করা গেছে। বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এক যোগে কাজ করে যাচ্ছে।

যথাযথ মর্যাদার সাথে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উদযাপনের লক্ষ্যে রাজশাহী জেলা প্রশাসন দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি করেছে। কর্মসূচির মধ্যে ছিল ১৪ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে জেলা শহীদ স্মৃতিফলকে শহীদদের স্মরণে পুস্পস্তবক অর্পণ এবং সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভা।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত