অন্য চোখে

তাসনুভা মেহ্‌জাবীন (১২), খুলনা

Published: 2019-12-12 12:41:26.0 BdST Updated: 2019-12-12 12:41:26.0 BdST

দীর্ঘ নয় মাস এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা লাভ করেছিলাম বিজয়। এ যুদ্ধে প্রাণ দেওয়া এবং অংশগ্রহণকারী সকল বীর ও দেশপ্রেমিক যোদ্ধাদের আমরা প্রতিদিনই স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধার সাথে।

জীবনের পরোয়া না করে যুদ্ধে যাওয়া এমনই এক যুদ্ধাহত বীরযোদ্ধার সাথে কথা হয় হ্যালোর।

হাস্যোজ্জ্বল মুখ, কাঁচাপাকা চুলের স ম রেজওয়ান আলী মুক্তিযুদ্ধের সময় ৮ ও ২ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। মূলত খুলনার দৌলতপুর থেকে ফুলতলা পর্যন্ত সুদূর বিস্তৃত এলাকায়ই তিনি যুদ্ধ করেছিলেন।

তখন ছিলেন মাত্র দশম শ্রেণির ছাত্র, তারপরও দেশের টানে ছুটেছিলেন যুদ্ধে। পথে পথে ছিল মৃত্যুভয়, তবুও দেশকে স্বাধীন করতে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

যুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, "আমি তখন ছিলাম দশম শ্রেণির ছাত্র। খুলনার দৌলতপুরের মহসিন স্কুলে পড়তাম, সেখানে ক্যাডেট কমান্ডার ছিলাম। মোটামুটি যুদ্ধের অনেক কিছুই জানতাম, তারপরও ট্রেনিং নিতে যাই বিহার ক্যান্টনমেন্টে।"

খুলনার বিখ্যাত শিরোমণির সম্মুখ সমর, দ্য ট্যাংক ব্যাটল অব শিরোমণির অন্যতম অংশ ছিলেন তিনি। সেই যুদ্ধের স্মরণ করতে গিয়ে বলেন, "বিহার ক্যান্টনমেন্টে আমার ট্রেইনার ছিলেন মাহেন্দ্র সিং। ৭ ডিসেম্বর যৌথবাহিনী যশোর ক্যান্টনমেন্ট ক্লিয়ার করাকালীন আমি ছিলাম যশোরের মণিপুর এলাকায়। মাহেন্দ্র সিং আমায় বললেন যে 'তুম ইধার কিয়া করতা হে?' (তুমি এখানে কী করছ?)। তিনি আমায় এবং আমার সাথে তিনজন আলকাস, কুদ্দুস ও গণিকে খুলনায় নিয়ে আসলেন।

"খুলনায় এসে আমরা মূল দলের সাথে মিলি। আমাদের মশিয়ালী, গাবতলা, ইস্টার্ন, আটরা, আফিল, মাত্তমডাঙা, গিলাতলা, মীরেরডাঙা, শিরোমণি, ডাকাতিয়া, যুগীপোল, এলাকাগুলোতে ক্লিয়ার করতে বলা হয়।

"৮ তারিখে পাকবাহিনী এসকল এলাকায় এসে ১২-১৩টা গ্রামের সমস্ত লোকজন বিতাড়িত করে, শুধু কিছু রাজাকারের পরিবার থাকে। ডাকাতিয়া বিল থেকে ভৈরব নদী পর্যন্ত সমস্ত এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। যেহেতু এই এলাকায় প্রতি বছর তারা ফিল্ড ফায়ারে আসত তাই এলাকায় সম্পর্কে ভালো করে জানা ছিল, তাই এ জায়গাটা তাদের স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।

"৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত এখানে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। মেজর মঞ্জু ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা ঘাঁটি করি ফুলতলা ১৪ মাইলে। যুদ্ধে আমরা প্রায়ই মর্টার শেলের ব্যবহার করতাম। প্রচণ্ড যুদ্ধের পরও শিরোমণির এইদিকটাতে আমরা ক্লিয়ার করতে পারছিলাম না। আকাশপথে যৌথবাহিনী থেকে রিফ্লেক্ট ফেলা হয়, তারপরও পাকবাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যায়।"

"হঠাৎ করে ১৩ তারিখে তারা যুদ্ধ স্থগিত করে। এটা মূলত একটা কৌশল ছিল। আমরা বুঝতে পারলেও মেজর মাহেন্দ্র সিং ও মেজর গণি ২৫-২৬টা কনভয় নিয়ে নিয়ন্ত্রণ পাবার আশায় ঢুকে পড়ে। আফিল গেট পার হবার পরই দলটার ওপর পাকবাহিনী প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। সাড়ে তিনশ মিত্রবাহিনীর সৈন্য এতে শহীদ হন। মেজর মাহেন্দ্র সিং একা ফিরে যেতে পারেন।

“আমরা তখন অন্য কৌশল অবলম্বর করি। ১৪ তারিখ সকাল থেকে ইস্টার্ন গেটের পেছন দিয়ে নদী পার হয়ে সিদ্ধিরপাশা পার করে বারাকপুরে আসি। ঐপাশ দিয়ে পুরো দৌলতপুর পর্যন্ত মিত্রবাহিনী সাথে নিয়ে মর্টার দিয়ে আক্রমণ করি। আবার ফুলতলা, ডাকাতিয়া বিল এবং দৌলতপুর দিয়েও আমাদের অন্যদল আক্রমণ চালায়।

"১৫, ১৬ তারিখ যুদ্ধ চলে। ১৬ তারিখে সন্ধ্যার ভেতরে পাকবাহিনীর মূল দল ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে ফেলে। কিন্তু এখানে তখনো আত্মসমর্পণ করে না। তারপর দৌলতপুরের দিক দিয়ে আমাদের বাহিনী এগোতে থাকে, চারপাশ দিয়েই ধীরে ধীরে এগোনো শুরু করি। চতুর্দিকের আক্রমণে আটকা পড়ে ১৭ তারিখে অবশেষে দুপুরের দিকে সাদা পতাকা টানিয়ে দেয় অর্থাৎ আত্মসমর্পণ করে। সব শেষে স্বাধীন হয় আমাদের খুলনায়। ৩৭০০ সৈন্য আমাদের হাতে আত্মসমর্পণ করে।"

যুদ্ধ দিনের গল্প বলতে বলতে তিনি আরও বলেন, “এখানে সেক্টর কমান্ডার মেজর মঞ্জুর কাছে কে এম সিং, হায়াত মাহমুদসহ ৩৭০০ সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। ওদের ব্যাজ ও সোল্ডার নিজেদেরই খুলতে বলা হয়। তারা বলেছিল যে মুসলমানের সাথে মুসলমানের লড়াই করলে শত্রুর সাথে কারা লড়বে, তারা প্রচণ্ড লজ্জ্বিতও ছিল বলে মনে হয়।"

জয়ের পরের ঘটনা নিয়ে তিনি বলেন, “এই এলাকায় ১০-২০ গজ পরপর মাইন পোঁতা ছিল। মেজর মঞ্জুর ও ৯নং সেক্টরের কমান্ডার আত্মসমর্পণকারী সৈন্যদের সার্কিট হাউজে দিতে গেলে আমরা এখানে দায়িত্ব নিয়েছিলাম। সাতদিন পর্যন্ত আমরা কোনো সাধারণ মানুষ ঢুকতে দেইনি না। বহুকষ্টে মাইন উঠিয়ে তারপরে মানুষদের ঢুকতে দেই। প্রচুর অস্ত্রও পেয়েছিলাম, সাতটি ট্যাংকও ছিল। ভয়াবহ এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।

"দীর্ঘ নয়মাস আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, যুদ্ধ শেষে যাই পরিবারের কাছে। ছোট ছিলাম, তারপরও দেশের টানে চলে গিয়েছিলাম।"

তার পরিবার পুরোটাই এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। ছয় জন যুদ্ধ করেছিলেন তার পরিবার থেকে। তাদের মধ্যে শহীদ হন দুই জন। তার আপন ভাই শেখ খসরুজ্জামান যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন। আরেকজন তার চাচাতো ভাই, শেখ মাহতাব উদ্দীনের মৃত্যু হয় রাজাকারের হাতে।

অষ্টম শ্রেণি থেকেই তিনি ছাত্রলীগ করতেন, ভালোবাসতেন বঙ্গবন্ধুকে। ১৯৬৭ সালে প্রথম তার বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ হয়। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানেও রাজপথে নেমেছিলেন। ৭০ এর নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিলেন ৪২টি মিটিং এ।

বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে দেখতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে আসতে দেখেছি, মিটিং এ তিল ধারণের জায়গাও থাকত না।”

তিনি আরো বলছিলেন, "বঙ্গবন্ধুর আহ্‌বানে ২৬ মার্চ থেকেই রণক্ষেত্রে। ২৮ মার্চ দৌলতপুরে পাকবাহিনীর প্রথম আক্রমণ যখন হয় সেখানেও উপস্থিত ছিলাম। সৃষ্টিকর্তা কৃপায় বহুবার প্রাণ হাতে নিয়েও জীবিত ফিরেছি। পাশ থেকেই নিজের ভাইয়ের মৃত্যু দেখেছি।"

তার বর্তমানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, "আমরা যারা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে আছি তাঁরা চাই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে উঠুক। বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছে তাদের পা যেন এই বাংলায় মুক্তভাবে না পড়ে। বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করতে বলব এবং দেশের বিশ্বাসঘাতকদের থেকে হুঁশিয়ার থাকতে বলব। যুদ্ধাপরাধীদের যথাযথ শাস্তিও আমি কাম্য করছি।"

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, "যারা যুদ্ধে মারা গিয়েছেন তাদের আত্মার শান্তি হবে একভাবেই যদি তাদের আত্মত্যাগ সার্থক হয়ে ওঠে। আমিও মারা যেতে পারতাম, বড়ই রিস্ক নিয়েও দেশের জন্য লড়েছি। এখন শুধু তোমাদের কাছে এটাই চাই, তোমরা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসো ও ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলো।"

অশ্রুসিক্ত কিন্তু হাসিমুখ নিয়ে কথা শেষ করেন, মনে কোনো কষ্ট তার নেই কারণ স্বাধীনতার সূর্য নিজের চোখে দেখেছেন ও দেখছেন।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত