অন্য চোখে

তানভীর ইবনে কবির (১৬), বগুড়া

Published: 2019-10-28 18:12:17.0 BdST Updated: 2019-10-28 18:12:17.0 BdST

‘জিপিএ পাঁচ না পেলে কিচ্ছু হবে না-’ এমন কথার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। বিশেষ করে আমরা যারা পিইসি, জেএসসি বা এসএসির মতো ধাপগুলো অতিক্রম করে এসেছি বা পড়ছি তাদের কাছেই শুনতে হয়।

ছোটবেলা থেকেই আমাদের কানের কাছে ভালো ফলাফল বা জিপিএ-পাঁচের বুলি আওড়ানো হয়েছে। মনে পড়ে পঞ্চম শ্রেণির কথা। তখনই শুনতে হয়েছে, জিপিএ পাঁচ না পেলে জীবন বৃথা।

আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবলে বড়ই অদ্ভুত লাগে। দশটা বছরের স্কুল জীবনে তিনবার বার বসতে হয় বোর্ড পরীক্ষায়। তারপর আবার এইচএসসিতে। প্রতিবারের লক্ষ্য মোটামুটি নির্ধারিত, ভালো ফলাফল বা জিপিএ পাঁচ নামক সোনার হরিণ।

পত্রিকার এক খবর পড়ে জানতে পারলাম, গেল বছর এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের এক দিনের ব্যবধানে অন্তত ১৯ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এবং পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এবছর পরিসংখ্যান আরো ভয়াবহ। গেল কয়েক বছরও বিভিন্ন সময় এমন খবরই গণমাধ্যমে উঠে আসে। এর পেছনে দায়ী কারা?

তার আগে বলি, এবার এসএসসিতে বসেছিলাম। বাবা মায়ের প্রত্যাশা ছিল ব্যাপক। তবে আশানুরূপ ফল হয়নি। স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। তখন পারিপার্শ্বিক অবস্থার দেখে আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে আঁচ করতে পেরেছিলাম। জেএসসি পরবর্তী আশানুরূপ জিপিএ না পাওয়ায় অনেক সহপাঠীকেই কাছ থেকে ঝরে যেতে দেখেছি। এসএসসি পরবর্তী ঘটনাও ব্যতিক্রম নয়।

আমাদের দেশে ভালো ছাত্রের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে জিপিএ-পাঁচ। অকৃতকার্য হওয়া বা জিপিএ পাঁচের নিচেও যে একটা পয়েন্ট আছে এটা যেমন আমরা শিক্ষার্থীরা ভুলতে বসেছি তেমনি ভুলে গেছেন আমাদের অভিভাবকরা।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বা আমাদের যোগ্যতা এতোটা উচ্চ পর্যায়ের না যে আমরা সবাই পাশ করব বা জিপিএ পাঁচ পাব। তবে এই কথা আমাদের অভিভাবক শিক্ষকরা জানলেও তা মানতে নারাজ।

২০০১ সালে এসএসসিতে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হয়। পরিসংখ্যান মতে, তখন জিপিএ-পাঁচ পায় মাত্র ৭৬ জন। আর ২০০২ সালে বেড়ে ৩৩০ জন, ২০০৩ সালে এক হাজার হাজার ৫৯৭ জন। এরপর ২০০৪ সালে তা এক লাফে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ৮ হাজার ৫৯৭ জন এবং ২০০৫ সালে বাড়ল প্রায় দ্বিগুণ, ১৫ হাজার ৬৩১ জন। 

প্রথম কয়েক বছর কেউ জিপিএ-পাঁচ এর কাছাকাছি পেলেও মেধাবী হিসেবে গণ্য হতো। পরবর্তী সময় জিপিএ-পাঁচ ছেড়েছে লাখের কোঠা। এবার মোট জিপিএ-পাঁচ পেয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৯৪ জন। গতবার জিপিএ-পাঁচ পেয়েছিল এক লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন।

এতো এতো জিপিএ-পাঁচের ভিড়ে নিজের ফলাফল যখন মন মতো না হয় তখন কেউই কথা শোনাতে বাকি রাখে না। রেজাল্ট পরবর্তিতে আমাদের মানসিক অবস্থা তো বোঝেনই না। তার সাথে পরিবার, স্কুল সর্বোপরি সামজটাই তুচ্ছতাচ্ছিল্যে মেতে ওঠে। ‘সব শেষ’ ধরনের কথা না শুনিয়েও ছাড়েন না।

এসএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে কলেজে ভর্তির নিয়মের কারণে জিপিএ-পাঁচ প্রাপ্তরা ভালো কলেজে পড়ার সুযোগ পায় অন্যরা বঞ্চিত হয়। আর দেশের নামী কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনের শর্তে বিজ্ঞানের জন্য এসএসসি ও এইচএসসিতে পদার্থ, রসায়ন, গণিত ও ইংরেজিতে জিপিএ-পাঁচকে করা হয়েছে বাধ্যতামূলক। 

তাই জিপিএ-পাঁচ না পেলে তখন আমাদের সহপাঠীরা অনেকেই পড়ালেখার গতি হারিয়ে ফেলে। অনেকেই আবার লোকলজ্জা, সমাজের কথার ভয়ে সহজ সমাধান হিসাবে আত্মহত্যাকেই বেঁছে নেয়। এমন সমস্যা এক দিনে তৈরি হয়নি। এর জন্য কেউই একক ভাবে দায়ী নয়। অনেকেই দায়ী।

ভালো রেজাল্টের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। তবে জিপিএ-পাঁচ না পেলে বা ভালো রেজাল্ট না হলেই যে সব শেষ এমন তো না। আমাদের সহপাঠী বন্ধুরা কেউ ভালো লিখতে পারে, কেউ ভালো খেলতে পারে, কেউ বা ভালো বলতে পারে। আমাদের অভিভাবকরা আমাদের পছন্দের বিষয়কে অগ্রাধিকার দিলে আমরা আমাদের বিকশিত করতে পারব।

আজ আমরা শিক্ষা লাভের মূল উদ্দেশ্য ভুলে গেছি। আমরা ভুলে গেছি ভালো ফলাফল শিক্ষা লাভের মূল উদ্দেশ্য নয় বরং এর মূল উদ্দেশ্য মনুষ্যত্ব অর্জন করা।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত