অন্য চোখে

অগ্রঃ (১০), সাতক্ষীরা

Published: 2019-05-25 15:46:41.0 BdST Updated: 2019-05-25 15:48:27.0 BdST

কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি কবি। এই কবি বাংলা কাব্যে অগ্রণী ভূমিকার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। বাংলাভাষার অন্যতম সাহিত্যিক বাংলাদেশের জাতীয় কবি কবিতা ও গান পশ্চিমবঙ্গসহ দুই বাংলাতেই সমানভাবে সমাদৃত। শিশু তরুণ বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের কাছে কবির লেখা সমান জনপ্রিয়।

কবিতা ও গানে বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে বিদ্রোহী কবি বলা হয়। তার কবিতার বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে, মানুষের প্রতি মানুষের অত্যাচার ও দাসত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

বাংলার মননে নজরুলের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সব সময় ছিলেন সোচ্চার।

অগ্নিবীণা হাতে তার প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তার প্রকাশ, যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনের কাজেও ‘বিদ্রোহী কবি।’

মাত্র নয় বছর বয়সে ১৯০৮ সালে  এক দরিদ্র পরিবারের এই সন্তান তার বাবাকে হারান। ‘দুখু মিয়া’ নামেই তিনি ছেলেবেলায় পরিচিত ছিলেন।

গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পাশ, মক্তবে শিক্ষকতা, মাজারের খাদেম, গানের দল ‘লেটো’র সদস্য হয়ে পালাগানও রচনা করেন।

মক্তব, মসজিদ ও মাজারের কাজে নজরুল বেশি দিন ছিলেন না। বাল্যকালেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বাংলার রাঢ় অঞ্চলের কবিতা, গান ও নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক চর্চার ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল লেটো নামে পরিচিত দলে যোগ দেন তিনি।

ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে তার পড়াশোনা শুরু। স্থানীয় এক মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজও করেন। বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে গিয়ে কবিতা, নাটক ও সাহিত্য সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করেন তিনি।

ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এ সময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন। তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। রচনা করেন বিদ্রোহী এবং শেকল ভাঙার গানের মতো কবিতা; ধূমকেতুর মতো সাময়িকী। জেলে বন্দী হলে লেখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী। এই সব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট।

তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি, বিদ্রোহ, শৈশব, কৈশোর। ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন।

কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। তার বাবা ছিলেন স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম। তারা ছিলেন তিন ভাই এবং তিন বোন। তার ভাই বোনরা হলেন, কাজী সাহেবজান, কাজী আলী হোসেন, উম্মে কুলসুম।

নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং সুর করেছেন। যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা নজরুলগীতি নামে পরিচিত। মধ্যবয়সে তিনি পিক্স ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে দীর্ঘদিন তাকে সাহিত্য কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। একই সাথে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

১৯৭১ সালের মুক্তি যুদ্ধে বাঙালির বিজয় লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

১৯৭২ সালের ২৪ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। 

কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তার বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তনে তাকে এই উপাধি প্রদান করা হয়।

১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

যথেষ্ট চিকিৎসা সত্তেও নজরুলের স্বাস্থ্যের বিশেষ কোনো উন্নতি হয়নি। কবির জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ সালের ২৯ অগাস্ট সকাল ১০টা ১০ মিনিটে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বেতার এবং টেলিভিশনে কবির মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হলে পিজি হাসপাতালে শোকাহত মানুষের ঢল নেমে আসে। স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজায় হাজারো মানুষ শামিল হয়। নামাজে জানাজা শেষে শোকযাত্রাসহ কবির জাতীয় পতাকাশোভিত মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়। শেষ হয় রুটি বানানো শ্রমজীবী থেকে জাতীয় কবি হয়ে ওঠা কাজী নজরুল নামের এক মহামানবের জীবন অধ্যায়।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত