অন্য চোখে

রুসাফা শারমিনদ্ শানহা  (১৫), ঢাকা

Published: 2019-04-11 22:04:58.0 BdST Updated: 2019-04-11 22:04:58.0 BdST

বাংলাদেশের গাজীপুর ও ঢাকার ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে তুরাগ নদী৷

এক সময় বাণিজ্যিক যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নদীটি। গাজীপুর অঞ্চলের মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ এ নদী আজ শিল্পায়নের প্রভাবে মৃতপ্রায়।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কোনাবাড়ি বিসিক, মৌচাকসহ আশেপাশের এলাকায় রয়েছে শত শত শিল্পকারখানা। শিল্পকারখানা থেকে নিষ্কাশিত বর্জ্য অপসারণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এ নদী।

অন্যদিকে কাশিমপুর, গাজীপুর সদর উপজেলার মণিপুরসহ বিভিন্ন এলাকার শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য তুরাগে মিশছে। নদীর দুই পাড় দখল করে প্রভাবশালীরা বিনাদ্বিধায় বহুতল ভবন নির্মাণ করছে। ফলে দিন দিন নদীর হারাচ্ছে নাব্যতা। কোথাও কোথাও খালে পরিণত হয়েছে এই তুরাগ।

ঢাকার কিনারা দিয়ে বহমান চারটি নদী- বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু এবং শীতলক্ষ্যা-বাঁচাতে ২০১৯ সালের ২৫শে জুন হাইকোর্ট ১২ দফা নির্দেশনা দেয়। এর মধ্যে উল্লেখ্যোগ্য হচ্ছে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে পাকা খুঁটি বসানো, তীরে হাটায় পথ নির্মাণ ও বনায়ন, তীরের জমি খনন করা ও নাব্যতা সংকট দূর করা প্রভৃতি।

হাইকোর্ট থেকে শিল্পকারখানাগুলোতে ইটিপি প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ভূমি, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, নৌপরিবহন, বন ও পরিবেধ মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ ও গাজীপুরের জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কতৃর্পক্ষকে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের আদেশ দেওয়া হয়।

যদিও পরবর্তী ৮ বছরে তার বাস্তবায়ন ঘটেনি। নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে মামলা করা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই। রাজনৈতিক প্রভাবে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে।

গত ৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট তুরাগের সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে গণপূর্ত বিভাগ সীমানা নির্ধারণী পিলার বসায়। কিন্তু দেখা গিয়েছে-পিলার বসানো হয়েছে অনেক জায়গা ছাড় দিয়ে। পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএ যে রাস্তা তৈরি করেছে সেখানেও ১০ থেকে ২০ ফুট জায়গা ছাড় দেওয়া হয়েছে। বলাই বাহুল্য ছাড় দেওয়া জায়গাগুলো বহুদিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলেও আওতায় রয়েছে।

এসব অনিয়ম ও কারচুপির ফলাফল হিসেবে তুরাগ আজ প্রায় মৃত। এক সময় তুরাগ নদীর পানি শোধন করে গাজীপুরের মানুষদের সরবরাহ করা হতো। এখন দূষণের মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে শোধন করা সম্ভব হচ্ছে না। আগে দেশি মাছের চাষ হতো এ নদীতে, এখন এর পানি জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার অনুপযোগী হয়ে গেছে৷ ফলে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র।

কৃষিকাজ ও দৈনিক জীবিকা নির্বাহ করা তুরাগপাড়ের মানুষের জন্য দিনদিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এক সময় এ নদীর পাড়ে প্রচুর মানুষ বেড়াতে যেত। এখন দুর্গন্ধে আর আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ট্যানারির বর্জ্যের প্রভাবে পাশ দিয়ে হেঁটের যাওয়াও কঠিন।

ব্রিটিশ আমলে ঢাকায় বাণিজ্য করতে আসা মানুষদের যাতায়াতের প্রধান রাস্তা ছিল তুরাগ নদী। আজ সেখানে নৌকা চলাচলও যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। ফলে সে ঐতিহ্যবাহী জেলেপাড়া এবং মাঝিপাড়া আজ বিপন্ন।

তুরাগ নদীতে এখন কোন জলজ প্রাণীর আবাস না থাকলেও রয়েছে নানা প্রজাতির মশা। ফলে সেই অঞ্চলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ায় প্রকোপ বাড়ছে। টঙ্গী ব্রিজের উপর মাচা তৈরি  করে দীর্ঘ ১৫ বছর যাবৎ বসবাস করছেন শতাধিক বেদে। তারা বর্তমানে নানা চর্মরোগে আক্রান্ত।

দেশকে বাঁচাতে হলে, বাণিজ্য সম্প্রসার করতে হলে আগে বাঁচাতে হবে নদীকে। তাই তুরাগ নদীকে রক্ষা করতে এখন কর্তৃপক্ষের যথাযথ এবং আপোসহীন পদক্ষেপ নেওয়া অতীব প্রয়োজনীয়।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত