অন্য চোখে

পৃথা প্রণোদনা (১৫), ঢাকা 

Published: 2018-05-14 20:26:51.0 BdST Updated: 2018-05-16 20:24:55.0 BdST

ভারতের ফোকলোরবিদ ড. শেখ মকবুল ইসলাম সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে হ্যালোর মুখোমুখি হন। এ বিষয়ে তার অনেক গবেষণা আছে। বাংলাদেশসহ পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার নানা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা ও বিষয়টির তাৎপর্য নিয়ে কথা বলেন তিনি।

বর্তমানে বাংলাদেশে লোকসংস্কৃতি বা ফোকলোর চর্চা বিষয়ে শেখ মকবুল বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ পুরোটাই লোকসংস্কৃতির একটি খনি। মানে বিভিন্ন ধরনের লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন শাখা বিশেষ করে লোকসংগীত, লোকনাটক, লোক শিল্পকলা, মোট কথা লোকায়ত জীবন বা ফোকলাইফ বলতে যেটা আমরা বুঝি সেটা বাংলাদেশ জুড়ে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আছে।

পুরো মানচিত্রে, বাংলাদেশ লোকসংস্কৃতির ধারণ ও বাহনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ একটি দেশ। বাংলাদেশে লোকসংস্কৃতি চর্চাটা খুবই বেশি এবং এখানে একাডেমিক দিক থেকেও লোকসংস্কৃতি চর্চাটা সুগঠিত ও বিধিবদ্ধভাবে করার একটা চেষ্টা বা পরিকল্পনা আছে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকসংস্কৃতির বিভাগ রয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি বাংলা একাডেমী লোকসংস্কৃতি বিষয়ে একটি আন্তজার্তিক পঞ্চম ওয়ার্কশপ করেছে।

এছাড়াও আমরা লক্ষ্য করেছি, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে লোকসংস্কৃতি বিষয়ে গবেষণার কাজ প্রচুর হয়েছে। প্রচুর পিএইচডি-র কাজ শুরু হয়েছে এবং লোকসংস্কৃতি নিয়ে প্রচুর গবেষণার উদ্যোগ এদেশের আছে।    

তিনি বলেন, লোকসংস্কৃতির অনেকগুলো ক্ষেত্রে কাজ করেছি। এর মধ্যে লোকসংগীত আমাকে খুব টানে। লোকসংগীতের আকর্ষণীয় শক্তি অনেক বেশি। ফোক মিউজিকলোজি ইত্যদি বিষয়গুলোও আমাকে খুব আকৃষ্ট করে। এর পাশাপাশি লোকায়ত সাহিত্যের ক্ষেত্রে কতগুলো প্রবাদ, ধাঁধাঁ আছে। এগুলো নিয়ে কাজ করেও আমি বেশ আনন্দ পাই।   

তিনি একথাও বলেন, বাংলাদেশসহ, পশ্চিমবাংলা, ত্রিপুরা ইত্যাদি প্রতিবেশী জায়গাগুলোতে অর্থাৎ যতটুকু জায়গা জুড়ে বাঙালির ভৌগলিক বিস্তার, সব জায়গাতেই লোকসংস্কৃতির ধারা, খুবই শক্তিশালী। আর এ বিষয়টি গুরত্বপূর্ণ কারণ লোকসংস্কৃতির ভিতরেই আমাদের আত্মপরিচয় লুকিয়ে আছে। সবকিছুরই মূল শিকড় হলো লোকসংস্কৃতি। ফলে একটি জাতির শিকড় সন্ধানের জন্য লোকসংস্কৃতি চর্চাটা অত্যন্ত জরুরি।

লোকসংস্কৃতির ধারা ও এর চলমানতার ক্ষেত্রে কিছু গভীর সঙ্কটের কথাও বলেন তিনি। সঙ্কটটি হলো, বহুক্ষেত্রে সংস্কৃতির ধারা ও সংস্কৃতির মূল শেকড় থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি, দূরে সরে যাচ্ছি। সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের কোথাও একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে।  বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে যে প্রজন্ম উঠে আসছে, যে প্রজন্মের সাথে ফোকলাইফ বা লোকায়ত জীবনের সম্পর্ক খুব কম।

লোকসংস্কৃতিকে নিয়ে বাঁচার যে শিক্ষা, এই শিক্ষাটা প্রত্যেকের জন্য একান্তভাবে জরুরি। তা না হলে লোকসংস্কৃতি হারিয়ে যাবে। 

যেমন কলকাতার অনেক শিশুরাই জানে না যে ভাতু গান, তুসু গান কী। ঠিক হয়তো তেমনই বাংলাদেশের শিশুরাও এই দেশের আঞ্চলিক গানগুলো সম্পর্কে জানে না। 

ড. মকবুল মনে করেন, একজন মানুষের শিক্ষার প্রথম ধাপ হলো পরিবার। সেখান থেকেই একজন মানুষ শিখতে শুরু করে। বাড়িতে যদি লোকায়ত সংস্কৃতির ধারা চলমান না থাকে, তাহলে শিশুদের জন্য এই বিষয়ে জানা খুবই কষ্টকর।

সংস্কৃতির সচেতনতাটা প্রত্যেকের মধ্যে থাকাটা খুব দরকার এবং সেটা স্কুল পর্যায় থেকে শুরু হওয়া বাঞ্ছনীয়। স্কুল কলেজের পাঠ্যক্রমে বিষয়টির খুব প্রাথমিক জিনিসগুলি যদি যুক্ত করা হয়, তাহলে শিশুদের সাথে লোকসংস্কৃতির পরিচয়টা খুব দ্রুত ঘটবে।

তার মতে, ফোকলোর বিষয়টি মানুষের জীবন জুড়ে থাকাটা একটি সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। এটিকে যদি আলাদা কোন বিষয় বলে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে ভুল হবে। লোকায়ত জীবন জুড়ে একটি সাংস্কৃতিক বাস্তবতা এবং সংস্কৃতির চলমানতার নাম লোকসংস্কৃতি।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত