অন্য চোখে

তন্ময় বিশ্বাস (১৬), যশোর

Published: 2018-04-12 15:33:16.0 BdST Updated: 2018-04-12 15:33:16.0 BdST

সময়ের ধারায় এগিয়ে চলেছে সভ্যতা। সাথে বদলে যাচ্ছে জীবন-ব্যবস্থা। যার ফলশ্রুতিতে মানুষ একদিকে যেমন আয়ত্ব করছে বা অভ্যস্ত হচ্ছে নতুন অনেক কিছুর সাথে, তেমনি আধুনিকতার ভাঁজে চাপা পড়ে যাচ্ছে অনেক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে প্রায় হারাতে বসেছি অনেক কিছুই। এমন একটি বস্তুগত সংস্কৃতি হলো ‘চিঠি-পত্র’। বর্তমান জীবনে যার ব্যবহার হয়ে দাঁড়িয়েছে বেশ সংক্ষিপ্ত ও সীমাবদ্ধ। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক বা দাপ্তরিক কাজে কাজের বাইরে হাতে লেখা চিঠি-পত্র আদান-প্রদানের রীতি এখন প্রায় নেই বললেই চলে।

তবে এর জন্য একক কোনো বিষয় বা শ্রেণির মানুষকে দায়ী করা চলে না। কারণ বর্তমানে সব কাজের ক্ষেত্রেই প্রাধান্য পায় সময়, শ্রম ও অর্থের সাশ্রয়। যোগাযোগের বিষয়টিও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই সুবিধা ও প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই প্রযুক্তির অগ্রগতিতে কমে এসেছে চিঠির ব্যবহার।

মানুষ ভাব বিনিময়ে ভাষার ব্যবহার আয়ত্ব করার পর প্রয়োজন পড়ে পরস্পরের তথ্য আদান-প্রদান। এর থেকেই উদ্ভাবিত হয় চিঠির ধারণা। প্রথমদিকে তীরের মাধ্যমে, এরপর ঘোড়ায় করে, কবুতর বা বেলুনের মাধ্যমে, সবশেষে এলো ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

কয়েক দশক আগেও যেটি ছিল তথ্য আদান-প্রদানের সবচেয়ে প্রচলিত এবং গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

পূর্বেকার দিনে চিঠি ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে জাতীয় ও সামাজিক ক্ষেত্র জুড়ে দৃশ্যমান ছিল লক্ষণীয় ব্যবহার।

বাংলা শিল্প-সাহিত্যের নিদর্শন যেমন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের রচনা পর্যালোচনা করলে তাঁদের প্রায় রচনার মধ্যেই চিঠি উল্লেখ পাওয়া যায়। তখনকার সময় রাজা ও কবিদের মধ্যে হতো পত্রালাপ। সাহিত্যের অনেকাংশ চর্চা হতো চিঠি লেখার মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, প্রাচীন অনেক চিঠি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসে সংরক্ষিত হয়েছে এবং আজও গুরুত্ববহন করছে।

এর থেকে বোঝা যায় পূর্বে চিঠির ব্যবহার কত প্রয়োজনীয় ও বিস্তৃত ছিল। কিন্তু এখন সেই ক্ষেত্রগুলো দখল করে নিয়েছে ক্ষুদে বার্তা, ই-মেইল, ফেইসবুকের মতো ইন্টারনেটভিত্তিক আধুনিক প্রযুক্তি। যেগুলো অবশ্যই অনেক সুফল ও সুবিধা বয়ে এনেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা যায়।

পরিবারের বড়দের কাছে শুনেছি, যখন মোবাইল ফোন সহজলভ্য ছিল না তখন চিঠিই ছিল পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যোগাযোগ করার একমাত্র উপায়। সকলে অপেক্ষা করত হলুদ খামে মোড়া আপনজনের একটি চিঠির জন্য। সময় পেলে চিঠিতে ভেবে গুছিয়ে মনের কথা লিখত তাদের উদ্দেশ্যে। যেখানে শুধু তথ্য বা কথা নয়, মানুষের ভাষা ও উপস্থাপনগত সৌন্দর্য ও শিল্পবোধের পরিচয় মিলত। আর প্রিয় মানুষের চিঠি পাওয়ার পর আনন্দের সীমা থাকত না, বিশেষ বাবা-মা বা ভাই-বোনের। বারবার পড়ত আর যত্ন করে তুলে রেখে দিত। এসকল বিষয় আপনজনদের মনে অন্যরকম অনুভূতি বা ভালোলাগা তৈরি করত।

এখন ফোনের ক্ষুদের বার্তা অথবা ফেইসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়ে গেছে মুহূর্তের বিষয়। তবে এতে করে মনের ভাব প্রকাশে আন্তরিক অনুভূতি কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে। আপনজনের সাথে যোগাযোগ বা কথা বলার অনুভূতির স্থায়ীত্ব ততোটা দীর্ঘ হয় না।

আর ‘পেন-ফ্রেন্ড’ এর প্রচলন তো একপ্রকার উঠেই গেছে। এ সম্পর্কে অনেকেই জানে না, আর জানলেও শুধু শাব্দিক অর্থটুকু। যার মানে কলমী-বন্ধু, পত্র-বন্ধু বা পত্র মিতালী।

বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে এ ধারণাটা বেশ অস্পষ্ট। বন্ধুদের কাছে বা আপনজনদের কাছে তারা এখন চিঠি লেখার সুযোগ পায় না। আসলে প্রয়োজনই হয় না। ফলে কমে গেছে চিঠি লেখার প্রতি আগ্রহ। বর্তমান সময়ে নিজে হাতে চিঠি লিখে ভাব বিনিময় করে, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। 

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ব্যাকরণে চিঠি বা ব্যক্তিগত পত্র নামক একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যেখানে বাবা-মা অথবা বন্ধুর কাছে সাধারণ কিছু বিষয়ে নিয়ে নিজের মতো করে চিঠি আকারে লিখতে হয়। কিন্তু সেই চিঠি লেখার উদ্দেশ্যে আমাদের অনেককেই বই পড়ে মুখস্ত করে প্রস্তুতি নিতে হয়। আবার কখনো কখনো এসএসসি পরীক্ষার্থীকে চিঠি অথবা আবেদনপত্র লেখার নিয়ম হাতে কলমে শিখিয়ে দিতে হয়। অথচ তারা ই-মেইল বা ক্ষুদে বার্তা পাঠাতে বেশ দক্ষ।  নিজের চোখেই বাস্তবে এমন অনেক উদাহরণই দেখা যায়।

কিন্তু এর থেকে বেরিয়ে এসে যদি ব্যবহারিক জীবনে এটি স্বাভাবিকভাবে চর্চা করা যায়, তবে অবসরকে কাজে লাগিয়ে নিয়মিত লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। আর বিশেষ করে যারা লিখতে ভালোবাসে তাদের সৃজনশীলতা বিকাশে এবং ভাবনার জগতকে আরো প্রশস্ত করতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

বলতে গেলে, চিঠির ব্যবহার এখন হয়ে গেছে অনেকটা আনুষ্ঠানিক। এছাড়া স্বাভাবিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে হয়ে পড়েছে প্রায় অচল। তবে চর্চার অভাবে একদিন ‘চিঠি’ যেন শুধুমাত্র একটি আভিধানিক শব্দে পরিণত না হয়।

 

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত
  • ইংরেজির বড়াই

    ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি ভাষার পত্তন’ বলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রত্যেক দেশের মানুষেরেই একটি নির্দিষ্ট ভাষা রয়েছে, নির্দিষ্ট সংস্কৃতি রয়েছে। তবে আজ আমরা অনেকেই আমাদের ভাষা, সংস্কৃতিকে ভুলতে বসেছি। বর্তমানে নিজ দেশের সংস্কৃতি ও ভাষার তুলনায় আমরা অন্য দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি মেনে চলতে বেশি ভালোবাসি, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি!

  • মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে নাই যুদ্ধ সরঞ্জাম (ভিডিওসহ)

    চার বছর আগে টাঙ্গাইলে যুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স তৈরি করা হলেও সেখানে এখনও ঠাই পায়নি কোনো স্মৃতি বা যুদ্ধ সরঞ্জাম।

  • ফুটবল নিয়ে কুরুক্ষেত্র 

    খেলা বিনোদনের সেরা মাধ্যম। আমরা চার বছর অন্তর অন্তর ফিফার বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকি।