অন্য চোখে

আজমল তানজীম সাকির (১৩), ঢাকা

Published: 2018-04-07 21:59:41.0 BdST Updated: 2018-04-07 22:00:45.0 BdST

প্রায় প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার খবরই মর্মান্তিক। যার জীবনে দুর্ঘটনা ঘটে, তার নতুন করে বাঁচার জন্য উদ্যম হারিয়ে যায়। অন্ধকার নেমে আসে নিজের ও পরিবারের মানুষদের। ঠিক যেমন নেমে এসেছে ঢাকার তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের জীবনে।

তিনি বাবা-মাকে হারিয়েছেন অনেক আগে। টাইপ করে চালাতেন নিজের আর ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ। কিন্তু হয়তো তার আর সে সুযোগ হবে না। 

ঘটনা মঙ্গলবার দুপুরের। বাসে করে কলেজে যাচ্ছিলেন রাজীব। বিআরটিসির বাসের পেছনের ফটকে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ করে পাশ দিয়ে স্বজন পরিবহনের বাস বেপরোয়া গতিতে টক্কর দিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। দুই বাসের ফাঁকে চাপা পড়ে ডান হাত হারান রাজীব। যে হাত ছিল তার জীবন চালানোর হাতিয়ার, সে হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আটকে যায় দুই বাসের ফাঁকে।   

ঠিক এমন না হলেও নানা রকমের দুর্ঘটনা আছে অনেকের জীবনে। রাজীবের মতো তারাও পার করেছেন যন্ত্রণাকাতর সময়। হয়তো অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তাদেরক কেউ অঙ্গ হারিয়েছেন, কেউ হয়েছেন চিরতরে পঙ্গু, কেউবা হারিয়েছেন প্রাণ। কেউ আবার হারিয়ে যান সপরিবারেই।   

সড়ক দুর্ঘটনা যেন একটা ঝড়। ঝড় যেমন সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়, সড়ক দুর্ঘটনাও তেমন।   

দুর্ঘটনার খবর প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় আসে। টেলিভিশনের সংবাদে আসে। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হওয়া একটি পরিবারকে যে কত ঝড় সামলাতে হয় তার খবর রাখে না কেউ। তবু সড়ক দুর্ঘটনা থামে না। প্রতিদিন খবরের কাগজে দুর্ঘটনার খবর দেখতে দেখতে যেন চোখও সয়ে গিয়েছে। 

সাম্প্রতিক সময়েও ঘটেছে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা। ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২৮ মার্চ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান পুলিশের এক এসআই। আহত হন ১৫ জন। ১৬ মার্চ চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে নিহত হন এক বৃদ্ধ। ২৩ মার্চ ছুটির দিনে বিভিন্ন জায়গায় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৬ জন। এছাড়া ৫ মার্চ ঢাকার ধামরাইয়ে নিহত হন এক উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।

বাংলাদেশে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জন নিহত ও ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছে বলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

এত এত সড়ক দুর্ঘটনার খবর আসার পরেও টনক নড়ছে না কারও। রাস্তায় হামেশাই দেখা যায় এক বাস অন্য বাসকে টক্কর দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ছুটছে। বেপোরোয়া ওভারটেক করতে গিয়ে এক বাস যাচ্ছে ঠিক আরেক বাস ঘেঁষে বা ছেঁচড়ে দিয়ে। অনেক সময় গাড়ি চালনার দায়িত্ব দেখা যায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাঁধে। যা আইন বিরোধীও। লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালকের কিংবা ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যাও কম নয়। আর গাড়ি চালকদের এমন অসাবধনতা কিংবা পাল্লা দেওয়ার মতো খামখেয়ালের জন্য ঝরে যাচ্ছে বহু তাজা প্রাণ।  

সচেতন হচ্ছেন না যাত্রী বা পথচারীরাও। এ কর্মব্যস্ত জীবনে সবাই চান সময় বাঁচাতে। তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌঁছাতে। তবে জীবনের চাইতে সময়ের মূল্য বেশি না হলেও তাদের দেখা যায় ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে অসতর্কতার সাথে রাস্তা পারাপার হতে। বাসের জন্য অপেক্ষা না করে এক বাসেই বিপজ্জনকভাবে ঝুলে ঝুলে যেতে। অনেক সময় গণপরিবহনের অপ্রতুলতার কারণেও এমনটা হয়। হয় ট্রাফিক জ্যামের কারণে।   

রাজীব হয়তো বেঁচে যাবেন। তবে কাটাতে হবে পঙ্গু মানুষের পরনির্ভর জীবন। তার বুক থেকে হয়ত আক্ষেপ আর দুঃসহ স্মৃতি সরবে না। এরকম সড়ক দুর্ঘটনাগুলো নিভিয়ে দিচ্ছে রাজীবের মতো অনেকের স্বপ্নকে। থামিয়ে দিচ্ছে জীবন। রাষ্ট্র, পরিবহন মন্ত্রণালয়, চালক, যাত্রী ও পথচারী, সবার সচেতনতাইই পারে সড়ক দুর্ঘটনার গ্রাস থেকে বাঁচাতে। সাথে আইনের যথাযথ প্রয়োগ।  

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত