অন্য চোখে

তাসনুভা মেহ্জাবীন (১৩), খুলনা

Published: 2018-02-18 21:19:07.0 BdST Updated: 2018-02-18 21:42:35.0 BdST

নীলাচল পর্যটন কমপ্লেক্স।
ভ্রমণ সবার জন্যই খুবই আনন্দদায়ক। ঘুরে বেড়ানোটা সবার জন্য প্রত্যাশিত বিষয়ও বটে। আমারও কিন্তু তাই। সেই ছোটবেলা থেকেই ঘুরে বেড়ানোর শখ আমার।

আমি ঘুরেছিও অনেক। বাংলাদেশের ভেতরেই পরিবারের সাথে প্রায় সবখানে আমি গেছি। কিন্তু খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবান বাকি ছিল। এবার সেই অপূর্ণতা পূর্ণ হলো।

চলতি মাসের মাঝামাঝি দুপুরে খুলনা থেকে ঢাকা পৌঁছাতেই আমাদের রাত ১০টা বেজে যায় তবে দ্রুত ফেরি পেয়ে যাই।

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রোড ধরে যেতে কুমিল্লা এসে ঝামেলা হলো। শুনলাম, ফেনীর পথে নাকি ডাকাতি হয়। শেষে কুমিল্লার এক হোটেলেই আমাদের রাত কাটাতে হলো।  

পরদিন ভোরে উঠে কুমিল্লার বিখ্যাত মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই দিয়ে নাস্তা খেয়ে আমরা খাগড়াছড়ির  উদ্দেশ্যে রওনা দেই।

ফেনীর পর থেকে রাস্তাগুলো উঁচুনিচু আর বিপজ্জনক হলেও  আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক।

বিকেল হওয়ার আগেই আমরা খাগড়াছড়ি পৌঁছালাম। কিছুটা শংকিত ছিলাম যে সময়মতো পৌঁছাতে পারব কি না। কিন্তু আমরা সময়মতো পৌঁছে যাই। 

প্রায় তিনটার সময় সাজেকের উদ্দেশ্যে দিঘিনালা থেকে আমরা রওনা দেই। পথটা পুরোটাই খাড়া আর ত্রিপুরা ও অন্য আদিবাসীদের বাড়ির ভেতর দিয়ে।

পথে ছোট ছোট বাচ্চারা সারাক্ষণই দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো গাড়ি যেতে দেখলেই হাত নাড়ে এবং "চক্কে চক্কে" বলে চিৎকার করতে থাকে। কেউ একটা চকোলেট দিলে তারা "আরো আরো" বলে গাড়ির পেছনে দৌড়ায়।

আমরা এই তথ্য আগেই জানতাম। আমাদের সাথে তাই এক প্যাকেট চকলেট নিয়েছিলাম। কিন্তু পথে অনেক বাচ্চা থাকায় আমরা আমাদের সাথে থাকা মুড়ির মোয়া, কলা, আপেল সব তাদের দিয়ে দেই।

আদিবাসী বাচ্চাগুলোকে রুগ্ন, অপুষ্টিতে ভোগা।

এভাবে প্রায় দেড়ঘণ্টা চলার পর সন্ধ্যার কিছু আগে আমরা সাজেকে পৌঁছাই। রিসোর্টে রুম আগেই ঠিক করা ছিল। আমরা গিয়ে হাতমুখ ধুয়েই হেলিপ্যাডে চলে যাই। সেখান থেকে দেখা সূর্যাস্তের দৃশ্যটা ছিল অসাধারণ।

মনে হচ্ছিল পাহাড়ের মাঝে সূর্যটা হারিয়ে গেল। হালকা লালচে এবং বেগুনী আভা ছড়িয়ে দিয়ে সূর্য বিদায় নিল।

কাঠ দিয়ে গড়া আমাদের রিসোর্টের রুমগুলি এতো সুন্দর কীভাবে করল সেটা দেখে আমি অবাক হয়েছি। আর সাজেকে প্রচুর খাবার রেস্তোরাঁও রয়েছে।

বর্ষাকালে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশের কোড়ল দিয়ে এক রকম খাবার তৈরি হয়। কিন্তু আমরা তো এসেছি শীতকালে, তাই সেটা খাওয়া হলো না।  

পরেরদিন সকালে আমরা সূর্যোদয় দেখলাম। পাহাড়ের আড়ালে শুরুতে সূর্য দেখা না গেলেও প্রায় আধঘণ্টা পর সূর্য পাহাড়ের মাঝ দিয়ে উঁকি দিল।

হাঁটা পথে যেতে আমরা প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছিলাম। তাই নেমে আসতে হলো। দেখলাম সাজেকের পেছনের পাহাড়গুলো কুয়াশায় ঢাকা।

সাজেক থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম আলুটিলা গুহায়। যেমন শুনেছিলাম গুহাটি তেমন রহস্যময় মনে হলো না।

আলুটিলা গুহা থেকে বেরিয়ে চলে গেলাম রিসাং ঝর্ণায়। প্রায় ১০ কিলোমিটার হাঁটার পরে ঝর্ণা পর্যন্ত পৌঁছালাম। কিন্তু দৃশ্য দেখে সব কষ্ট ভুলে গেলাম। স্রোতে পিছল হওয়ায় ঝর্ণায় নামার সাহস হলো না।   

দুপুরে খেয়ে আমরা রাঙামাটির দিকে চলে গেলাম। রাতে রাঙামাটিতেই থাকা হলো। সকালে ঝুলন্ত ব্রিজ দেখে এবার বান্দরবান।

বান্দরবান থেকে নীলগিরি বেশি দূর হওয়ায় সেখানে যাওয়া গেল না। কিন্তু নীলাচল যাওয়া হলো। নীলাচল এবং সাজেকের সৌন্দর্য প্রায় এক রকম।

নীলাচলের এক রেস্তোরাঁয় খেয়ে কক্সবাজারের দিকে রওনা দিলাম। 

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত।

কক্সবাজার আমি আগে একবারও গিয়েছি। ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময়। কিন্তু কিছুই মনে নেই। তাই আবার যাওয়া হচ্ছে। কক্সবাজার পৌঁছালাম রাত ১১টায়। জোয়ার চলছিল বলে হোটেল থেকেই সমুদ্রের গর্জন শুনতে পেলাম।

ভোরবেলা উঠে আমরা কলাতলী বীচ। সেখানে খানিকক্ষণ সমুদ্রে লাফালাফি আর মেরিন ড্রাইভও হলো। মেরিন ড্রাইভে যে মজা পেয়েছি সম্ভবত জীবনে আর কিছুতে সে মজা পাইনি।

কলাতলী থেকে ফিরে ইনানী। গতবার ইনানী গিয়ে রীতিমত বিরক্ত হয়েছিলাম যে একই জিনিস দেখতে আবার যাওয়ার দরকার কী। কিন্তু এবার গিয়ে অবাক হলাম। ইনানীতে প্রচুর প্রবাল তৈরি হয়েছে।

সময় স্বল্পতার কারণে সেইন্টমার্টিন না যাওয়ার দুঃখ ভুলে আনন্দে মেতে উঠলাম। নীল আকাশ ও নীল পানিতে একাকার হওয়া দৃশ্য দেখতে লাগলাম।

দুপুরে হিমছড়ির এক রেস্তোরাঁয় খেলাম। পাহাড় অনেক দেখা হয়েছিল। তাই পাহাড়ে আর উঠা হলো না। সেখান থেকে লাবনী পয়েন্টের জন্য যাত্রা শুরু করলাম। লাবনী পয়েন্ট দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম।  

ভাঁটার সময় তবু সমুদ্রে নেমে গেলাম। কানে লবণ পানি ঢুকে গেল। মুখেও গেল, কিন্তু খুলনার মানুষের কাছে এ আর নতুন কী?

ছয় দিনের ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটল। আর কোনোদিন সাজেক, নীলাচল যাব কিনা জানি না। তবে তিন পার্বত্য জেলা আর কক্সবাজারের এই ভ্রমণ চিরদিন স্মৃতির পাতায় অম্লান থাকবে।

সেটা হতে পারে বাচ্চাদের চকলেটের জন্য চিৎকার, ধুলা মেখে মেখে হাইকিং, রিসাং ঝর্ণার পানি পড়ার শব্দ, নীলাচলের পাহাড়ের ওপরের কুয়াশা এবং সব্বাইকে, সব কিছুকে।

Print Friendly and PDF

সর্বাধিক পঠিত
  • শেরপুরেও বানানো হলো মানবতার দেয়াল (ভিডিওসহ)

    ‘তারুণ্যের জয় হোক, মানবতাবোধ জাগ্রত হোক’ এই স্লোগান নিয়ে শেরপুরে প্রথমবারের মতো চালু হলো মানবতার দেয়াল।

  • সততা স্টোর (ভিডিওসহ)

    ছাত্র অবস্থায় নৈতিকতা এবং সততার শিক্ষা দিতে বিক্রেতাবিহীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘সততা স্টোর’ উদ্বোধন করা হয়েছে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে।

  • গর্ভবতীর খাদ্যাভ্যাস (পর্ব ৩-ভিডিওসহ)

    গর্ভাবস্থায় নারী কী খাবেন বা খাবেন না তা নিয়ে রয়েছে নানা মত বা শঙ্কা। এই সময়ে নারীর খাদ্যাভাস নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন ডা. রোকেয়া গুলশান আরা।